আত্মার পরিবার

আত্মার পরিবার

তাসনিয়া আলী


ছোট্টো ইটের টুকরোতে হুইল চেয়ারের চাকা বাঁধা প্রাপ্ত হতেই ছিটকে কিছুটা দূরে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন নীলিমা চক্রবর্তী । নাকে এবং ঠোঁটে প্রচন্ড আঘাত পেলেন তিনি । কিছুটা কেটে গিয়ে অনর্গল রক্ত ঝরছে ঠোঁট দিয়ে। হাতের কনুই দিয়ে মাটিতে ভর করে তিনি হুইল চেয়ার অব্দি পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন আর গলা ফাটিয়ে ” রহমত রহমত ” বলে চিৎকার করছেন। কিছু সময় ব্যর্থ প্রচেষ্টা করার পর তিনি হঠাৎ স্মরণ করলেন , রহমত ঘণ্টা খানিক আগে শহরে গিয়েছে তার জন্য ঔষুধ কিনতে। নীলিমা চক্রবর্তী কোন ঠাই কুল না পেয়ে ওভাবেই শুয়ে রইলো। বিস্তীর্ণ ফুলের বাগানে তিনি একা সীমাহীন আকাশের নিচে শুয়ে আছে ।

প্রকাণ্ড সদর দরজার দিকে তাকাতেই সেদিনের কথা তার মনে পড়ে গেলো , এইতো কিছুদিন আগের কথা , টুকটুকে লাল বেনারসি শাড়ি , আলতা মাখা পায়ে, মাথা ভর্তি সিঁদুর দিয়ে কিছুদিন আগে তিনি এই বাড়ির সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করেছিলেন । সেইদিন আট বছরের ছোট্ট মেয়েটির কাছে লাল সিঁদুরের কৌটাটা পুতুল বউয়ের মতো লাগছিল। কিন্তু জমিদার বাড়ির ছোট বউয়ের দায়িত্বটা কিন্তু শক্ত হাতেই বুঝে নেওয়া লেগেছিল।
কত সব স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়ি । হাজার হাজার মানুষের আনাগোনা , এই বাগানেই উদযাপিত হতো দোলের অনুষ্ঠান । তার অকেজো হাত উপরের দিকে উঠিয়ে ভাবতে লাগলো , এই হাতে দুর্গা পূজোর সময় তিনি প্রতি বেলায় ২০০ মানুষের খাবার রেধেছে । এক হাতে ছেলে মেয়েদের মানুষ করেছে , উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছে ।
কিন্তু সেই প্রকাণ্ড চক্রবর্তী বাড়িতে তিনি আজ একা। বছর কয়েক আগে বাড়ির ছোট বাবু ( প্রদীপ চক্রবর্তী ) তাকে একা করে দিয়ে স্বর্গের সিঁড়ি তে পদার্পণ করলেন । তিন সু পুত্রের পিতা হওয়া শর্তেও মুখাগ্নি করেছিল তার ভাইপো। যদিও ভিডিও কলে তার পুত্ররা অনেক কান্নাকাটি সমবেদনা জানিয়েছিল। তার মায়ের একা হওয়ার পর থেকে তারা তার মাকে জন্মভূমি ছেড়ে তাদের নিকট বিদেশ বিভূঁইতে যাওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করেছিল কিন্তু তিনি রাজি ছিলেন না। তিনি শুধু একটাই অনুরোধ করেছে “তোরা আমার বুকে ফিরে আয় । আমি যে ক’দিন বাঁচবো তোদেরকে বুকে নিয়ে এই বাড়িতেই বাঁচবো। “
সফলতার শীর্ষে অবস্থানকারী সন্তানেরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে , দ্রুতই তারা মায়ের কোলে ফিরে আসবে । মাকে চিন্তা করতে না করেছে । গতকাল রাতেও ভিডিও কলে তার বড় ছেলে লন্ডনের সুনামধন্য ডক্টর. অমিত চক্রবর্তী তাকে চেক করেছে । কন্ডিশন দেখে কিছু ঔষুধ প্রেস্ক্রাইব করেছে । সেগুলো কিনতে রহমত শহরে গিয়েছে ।
আজ তার এই কঠিন সময়ে তার এক মাত্র আশ্রয় এই রহমত । রহমতের পুবপুরুষও তাদের বাড়িতে কাজ করতেন , রহমত তাকে সর্বক্ষণ দেখা শোনা করে। রহমত তার পরিবার নিয়ে জমিদার বাড়ির বাইরে একটি ঝুপড়ি তে বসবাস করে । রহমতের বউ যথাসময়ে এসে রান্না করে দিয়ে আবার তাদের ঘরে ফিরে যায় । কারণ গিন্নি মা ( নীলিমা চক্রবর্তী) অনেক ধার্মিক , সবসময় গঙ্গা জলে বাড়ি পবিত্র রাখার চেষ্টা করেন ।
রহমতের একটি ছোট্ট মেয়ে আছে , ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চাটি গিন্নি মাকে দেখলেই বলে , আসসালামওয়ালাইকুম গিন্নি দাদিমা । তিনি দুর থেকে বাচ্চাটিকে দেখে , ভালোই লাগে খুব মায়াবী চেহারা তার ।তিনি সবুজ ঘাসের উপর শুয়ে শুয়ে ভাবছি এইদিন রহমতের মেয়েটাকে একটি কাছে নিয়ে আদর করবো । অসহায় হৃদয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে তিনি । খুব ব্যাথা হচ্ছে তার , হঠাৎ আবছা চোখে দেখতে পেল , সাইকেল নিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই রহমত তাকে দেখেছে এবং সাইকেলটি ফেলে দিয়ে গিন্নি মা বলে দৌড়ে আসছে তার দিকে । এক গাল তৃপ্তির হাসি হেসে তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন ।
চোখ খুলে নীলিমা চক্রবর্তী নিজেকে তার ঘরে আবিষ্কার করলেন । তার চোখের সামনে ডক্টর এবং রহমতের পরিবার খুব চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তার জ্ঞান আসছে দেখেই রহমত দৌড়ে গেলো তার মাথার কাছে । তাকে প্রচন্ড আতঙ্কিত লাগে।
মমতাময় হাতে তার মাথা স্পর্শ করলো , ” গিন্নি মা ? খুব বেশি লাগছে নাকি ? আমারে ক্ষমা করে দেন । আর আপনারে একা থুয়ে কোন হানে যামু নানে ।” ” ঠিক বলছিস রহমত , আজকে থেকে আমার চোখের আড়াল হলে তোর নিস্তার নেই। কোথাও যাবি না । কাযা নামাজ পড়ার জন্য বাড়িতেও যাবি না । বুঝলি ?” ” হকচকিয়ে সে বললো , সব হইবো গিন্নি মা । আপনে আগে সুস্থ হউন। ” ” আমার বাড়ির দক্ষিণের ঘরটি আজকেই পরিষ্কার কর। তার পাশের টাও। ” ” ভয়ে ভয়ে সে উত্তর দিলো, কেন গিন্নি মা? কেও আসবে নাকি? “
” আজকে থেকে ওই ঘরে তুই তোর বউ বাচ্চা নিয়ে থাকবি ওই ঘরে । আর পাশের ঘরটা পরিষ্কার করে নিস , নামাজ কাযা গেলে তুই আর তোর বউ পড়িস। আর রহিমা ? প্রতিদিন আমার ঠাকুর ঘরটি কষ্ট করে একটু পরিষ্কার করে দিও মা । সাবিত্রীকে আর তেল মারা যায়না প্রতিদিন । তার তো অনেক কাজ , আমার বাড়িতে আসার সময় নেই।”
” আচ্ছা গিন্নি মা ।”কথাটি শুনেই রহমতের চোখ ভিজে এলো । কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো ? ” গিন্নি মা ? ” ” হ্যাঁ রহমত । আমি ঠিকই বললাম , এখন এইখান থেকে যা। সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে আয় । আর তোর মেয়েটাকে আমার কাছে রেখে যা ।”
রহমতের মেয়েটি তার কাছে এসে তাকে সালাম দিল। তিনি ওয়ালাইকুমুসসালাম উত্তর দিলেন । বাচ্চাটি আবার বলল , আমি নমস্কার বলতে পারি গিন্নি দিদিমা । কথাটি শুনে তিনি বাচ্চাটিকে তার কাছে টেনে নিলেন । তার বড় ছেলের ফোন আসলো। তিনি হাসি মুখে ফোন ধরে কথা বললেন । তাকে বলল , ” বাবা আমাকে নিয়ে আর চিন্তা করবে না। আমি আমার পরিবার নিয়ে অনেক সুখে শান্তিতে আছি ।”
লিখবেন আপনি প্রকাশ করব আমরা
নবীন-প্রবীন লেখকদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে গল্প, ছোটগল্প, ছড়া, কবিতা, রম্য রচনা,বুক-রিভিউ সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন- sahitto@thecampustoday.com
সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *