শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ০৬:০০ পূর্বাহ্ন

আমাদের বঙ্গবন্ধু ও আজকের বাংলাদেশ

  • আপডেট টাইম রবিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২১, ৯.৩৯ পিএম

 

স্বাধীনতার মহান স্থাপতি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর শত জন্মবার্ষিকীতে পদার্পণ করেছি আমরা। স্বাধীনতার ৫০ এ পদার্পন করেছি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আজকের এই দিনে প্রথম বিজয় অর্জন করেছিল বাঙালি জাতি ও আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি সোনার বাংলা। দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের পথে বাধাসমূহ চিহ্নিত করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে বাঙালি জাতি তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে কবি অন্নদাশঙ্কর রায় “বঙ্গবন্ধু” নামক কবিতায় লিখেছেন –
“যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা
গৌরী যমুনা বহমান,
ততদিন রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান।
দিকে দিকে আজ অশ্রু গঙ্গা
রক্ত গঙ্গা বহমান
নাই নাই ভয় হবে হবে জয়
জয় শেখ মুজিবুর রহমান।”

স্বাধীনতার মহান স্থাপতি  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাক-সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা শুরু করলে বাঙালি জাতি বীরদর্পে স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৪৭ সালে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতবর্ষ বিভক্ত হলেও দুইটি আলাদা প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তান গঠন করা যৌক্তিক ছিল না। যার ফলশ্রুতিতেই পাকিস্তান সরকারের অধীনে দীর্ঘ ২৪ বছর শাসন আর শোষণের দুর্দশার মধ্যে কেটেছে বাঙালি জাতির।

বিজ্ঞাপন

অবশেষে জাতিকে মুক্ত করতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। বাঙালির মুক্তির সনদ খ্যাত এই ভাষণের পরই বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে। আর ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে পাক হানাদার বাহিনীর গণহত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। সেই থেকে ২৬৬ দিনের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বীর বাঙালির ঐক্য আর সাহসিকতায় ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম এই পূন্যভূমির সূচনা হয়।

বীর বাঙালির সেই মুক্তিকামী মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারবর্গের শাহাদাত বার্ষিকী ১৫ আগস্ট। প্রতিবছর তাই এই দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসাবে অবিহিত করা হয় এবং শোকের মাস হিসাবে এই মাসটিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। শোকের এই মাসেই বঙ্গবন্ধু প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমাদের ‘অন্বেষী’ টিমের সদস্যবৃন্দকে নিয়ে গত ৩ আগস্ট, ২০১৯ ইং বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় গমন করি। যা এখন শুধু বঙ্গবন্ধুর সমাধি পরিদর্শন নয় বরং দেশি-বিদেশী পর্যটকদের নিকট একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে প্রবেশ করতেই দেখা মিলবে সবুজ শ্যামল ঘাসাবৃত ছোট্ট প্রাঙ্গন পেরিয়ে দীর্ঘ প্রবেশ পথের দক্ষিণে মসজিদ। উত্তরে নিচতলায় চমৎকার একটি লাইব্রেরী এবং চারপাশে ও উপরের গ্যালারীতে স্মৃতি সংগ্রহশালা বা জাদুঘর। মূল ফটক থেকে ভেতরে প্রবেশ করার পথে দক্ষিণ পার্শ্বে চারিদিকে বৃক্ষাবৃত শান বাধানো পুকুর রয়েছে। ভেতরে সমাধি কমপ্লেক্স এর পাশে একটি ঝর্ণা, পুরাতন বসতভিটা ও পিতৃভূমির নকশাযুক্ত ভবন এবং বঙ্গবন্ধুর পছন্দের আমগাছসহ বাগান আর আত্মীয় স্বজনের করব। মূল সমাধির ভেতরে পিতামাতার পাশে শায়িত আছেন বাঙালির মহান নেতা।

বিজ্ঞাপন

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ধানমন্ডির বাসভবনে স্বপরিবারে নির্মমভাবে নিগত হওয়ার পর বিশ্বের খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেন তার মধ্যে অন্যতম কিছু মন্তব্য লিপিবদ্ধ করছি…
১. মুজিব হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না, যারা মুজিবকে হত্যা করেছে তারা যেকোন জঘন্য কাজ করতে পারে। – (নোবেল বিজয়ী উইলিবান্ট)
২. শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারালো তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে। – (ফিদেল কাস্ট্রো)
৩. আপোষহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব আর কুসুম কোমল হৃদয় ছিল মুজিব চরিত্রের বৈশিষ্ঠ্য। – (ইয়াসির আরাফাত)
৪. শেখ মুজিব নিহত হবার খবরে আমি মর্মাহত। তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তার অনন্য সাধারন সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগনের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিল। – (ইন্দিরা গান্ধী)
৫. আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মত তেজী এবং গতিশীল নেতা আগামী বিশ বছরের মধ্যে এশিয়া মহাদেশে আর পাওয়া যাবে না। – (হেনরি কিসিঞ্জার)
৬. শেখ মুজিব নিহত হলেন তার নিজেরই সেনাবাহিনীর হাতে অথচ তাকে হত্যা করতে পাকিস্তানীরা সংকোচবোধ করেছে। (বিবিসি-১৫ আগস্ট ১৯৭৫)
বঙ্গবন্ধু আজ নেই, আছে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত পিতৃভূমি, আছে স্বাধীন সোনার বাংলা আর বাঙালির হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। যিনি ছিলেন কৈশরে দূরন্ত, যৌবনে বিপ্লবী, আর পৌঢ়ে বাঙালির মুক্তিকামী মহান নেতা।

স্বাধীনতার ৪ দশক পেরিয়ে সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন পরবর্তী বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে আমরা পৌঁছে গেছি। দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে উন্নীত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশনেত্রী শেখ হাসিনার দুর্বার নের্তৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নশীল থেকে উন্নতির সোপানে ধাবিত হচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ২০২১ সালে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে, ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়নের দেশে আর ১৯৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ অকল্পনীয় অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।  ইতোমধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন হল, দৃশ্যমান হল পদ্মা সেতুর মত দীর্ঘতম সেতু, নির্মাণ কার্য চলছে রূপপুর পারমাবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অসংখ্য উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ।

বিজ্ঞাপন

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে সর্বক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তন এসেছে। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতি, চিকিৎসা, খেলাধুলায় উন্নতির ছোঁয়া লক্ষ্যণীয়। স্বাধীনতা পরবর্তী মাথাপিছু আয় ১১০ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি আজ তা ১৯২৪ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। উ”চশিক্ষার দ্বার খুলেছে ব্যাপকভাবে, মাত্র ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বর্তমানে প্রায় ৫০ টিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা বৃদ্ধি পেয়েছে ; সরকারিকরণ করা হয়েছে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

তথ্য প্রযুক্তিতে দেশ এগিয়েছে  যা ঠিক, তবে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা এক্ষেত্রে অনেক পিছে ৷ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে আইসিটি নৈতিকতা মানা হয় না, আর তরুণ-তরুণীরা তথ্য প্রযুক্তি ব্যহারের চাইতে অপব্যবহারই বেশী করছে। ফলে তরুণেরা ধ্বংসের মুখে নিপতিত হতে চলেছে দিন দিন। সরকারের উচিত হবে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে সঠিক আইন বাস্তবায়ন আর বিপুল এই জনগোষ্ঠীকে কারিগরি ও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের সঠিক প্রশিক্ষণের সুব্যবস্থা করে জনসম্পদে রূপান্তর করা। তবেই আমরা পারব আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে অর্জন করতে। জাতি পাবে উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা আর বাসস্থানের পরিবেশ। দেশ হবে স্বনির্ভর আর স্বাধীনতার মহান স্থাপতি বাঙালি জাতির পথপ্রদর্শক বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশিত স্বপ্নের সোনার বাংলা।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বজুড়ে আজ বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অজস্র  রোড, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর, সেতু, ইকোপার্ক আরও কতো কি! কিš‘ বাঙালির হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি আজও। বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিনম্র  শ্রদ্ধা রেখে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে সোনার বাংলা গড়তে। তবেই বাংলাদেশ হবে সুখী সমৃদ্ধ সোনার দেশ, শান্তির পুন্যভূমি।

তথ্যসূত্রঃ
১) অসমাপ্ত আত্মজীবনী (শেখ মুজিবুর রহমান)
২) আমাদের শেখ মুজিব (কালীপদ দাস)
৩) হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু (সম্পাদনাঃ মোঃ আবুল কালাম আজাদ)
৪) রক্তাক্ত বাংলাদেশ (মোঃ হাবিবুর রহমান)
৫) মুজিবকে জানো, বঙ্গবন্ধুকে জানো (জেলা প্রশাসন, ঝিনাইদহ-২০২০)

বিজ্ঞাপন

লেখক –
তরিকুল ইসলাম মাসুম
শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

 

 

The Campus Today YouTube Channel

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
themesbazar_creativenews_II7
All rights reserved © 2019-20 The Campus Today