উচ্চ শিক্ষায় অবহেলার ৫০ বছর: গবেষণা নাকি রাজনীতি? পর্ব-২

উচ্চ শিক্ষায় অবহেলার ৫০ বছর: গবেষণা নাকি রাজনীতি? পর্ব-২

আবু জাফর আহমেদ মুকুল


গত ২৫ জুন, ২০১৯ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাতটি প্যাকেটজাত (পাস্তুরিত) দুধসহ ৭২টি খাদ্যপণ্য নিয়ে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

এই গবেষণায় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাতটি প্যাকেটজাত (পাস্তুরিত) দুধের নমুনা পরীক্ষা করে সেগুলোতে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়ার কথা বলা হয়।

ওই গবেষণা সম্পর্কে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী ও অতিরিক্ত সচিবের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ জুলাই, ২০১৯ আবারও একটি গবেষণায় একই সংখ্যক দুধের নমুনায় চারটি অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়ার কথা জানানো হয়। এই বাস্তবধর্মী গবেষনার ও জনবান্ধব গবেষনার জন্য তাকে সরকারি কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে সকল পক্ষের চাপ ও তাপ সহ্য করতে হয়েছিল। স্যারের ক্রান্তিকালীন সময়ে তাকে মেরুদন্ডহীন কিছু সহকর্মী লিখিত চিঠি দিয়ে সমর্থন প্রত্যাহার করেছে যা খুব দুঃখজনক বিষয় ছিল। আমার মনে আছে ঐ সময় আমার ৭-৮ জন স্যারকে সাহস যোগাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। অথচ স্বাধীন দেশে একজন শিক্ষকের স্বাধীনতা রয়েছে গবেষণাকে জনকল্যাণমুখী করার।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ে একটি পূর্বাভাষ রিপোর্ট তৈরিতে অংশগ্রহণ করায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ তাদের সবচেয়ে প্রথিতযশা গবেষকদের একজন মলয় কান্তি মৃধার বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের ডীন বলেন, “জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল বা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ে কোন গবেষণা করেনি, প্রকাশ করেনি, কাউকে দায়িত্বও দেয়নি।” তাদের দোষ প্রকৃত গবেষণা করা। তাই প্রকৃত গবেষণা করার জন্য অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের এবং মলয় কান্তি মৃধার জীবনের হুমকি এবং সকল পক্ষের রোষানলে পড়তে হয়েছিল। তবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় প্রাইভেট হওয়ায় মলয় কান্তি মৃধার উপর ঝড় একটু বেশি গেছে বুঝা যাচ্ছে।

এজন্য হয়তো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গবেষণার ফলাফল দেশে বাস্তবায়ন করতে চায় না। ভাবতে অবাক লাগে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ২টির পিএইচডি রয়েছে এবং সবচেয়ে বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন। সেও বাংলাদেশে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুদন্ডহীন ব্যবস্থাপনার কাছে হেরে গেছেন ভাবা যায়। তার সাথে এ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সাংঘর্ষিক এবং তার সাথে যায় না।

বিশ্ববিদ্যালয়–শিক্ষকের তিনটি কাজ: ১. নিজে গবেষণা করা; ২. অন্যকে গবেষণায় সহায়তা করা এবং ৩. পাঠদান করা।

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শুধু পাঠদান করলেই চলে। একজন কলেজ শিক্ষকের সঙ্গে একজন বিশ্ববিদ্যালয়–শিক্ষকের পার্থক্যটা এখানেই। শিক্ষকতা, কারিকুলাম, পাঠ্যক্রম, পাঠদান থেকে শুরু করে আমাদের প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয়–শিক্ষকদের যাবতীয় আচরণ ও কর্মকালে স্কুল -কলেজ শিক্ষকের মানসিকতা প্রতিফলিত হয়। মাস্টার্স পর্যায়েও তাঁরা সেমিনারের কথা ভাবতে পারেন না, কোর্স দিতে চান।

রাজনীতি-দুষ্টু শিক্ষাব্যবস্থায় ‘গবেষণার চেয়ে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিকে উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থান দেয়ায় দিন দিন সুনাম হারাতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও গবেষণার ক্ষেত্রে কম বরাদ্দ, গবেষণা কেন্দ্রগুলোর পরিচালকের দায়িত্ব রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য মহলের হাতে অর্পণ, দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষকদের গ্রুপিংয়ের মার প্যাঁচে প্রকৃত গবেষকদের ডিগ্রি প্রদানে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করায় গবেষণার মানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা হলো স্বাধীন পেশা। তাছাড়াও দেশের একজন শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে সংবিধান অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের স্বার্থে আপনি যে কোন বিষয়ে মতামত দিতেই পারেন। অনেক শিক্ষক আছেন কোন বিষয়ে মতামত না দিয়ে সকলের কাছে ভাল থাকতে চায়। এটাই তারা জীবনে একমাত্র সফলতা মনে করে। আসলে এটি মানুষের মেরুদন্ডহীন মানসিকতা পরিচয় বটে। এখন আসছি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি প্রসঙ্গে।

বাস্তবক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি আমার কাছে ৫ (পাঁচ) ধরনের ১. মূল রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিমূলক রাজনীতি। ২. প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের আঞ্চলিক রাজনীতি ৩. বিশ্ববিদ্যালয়টি যে জেলায় অবস্থিত যে জেলার শিক্ষকদের আধিপত্যের রাজনীতি ৪. প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা ছাত্রজীবনে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট ছিলেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ৫. নিজে পদ-পদবি বা সুবিধা পাওয়ার জন্য সকলকে তৈল-বাজি করার রাজনীতি।

বিশ্ববিদ্যালয় কতিপয় শিক্ষক আছেন কিভাবে প্রশাসনিক পদের জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব পাবেন? কিভাবে অনিয়ম করে নিজে একটি বড় বাসা পাবেন? এটার জন্য কর্তাব্যক্তিদের প্রতিদিন অফিসে ধরনা দিয়ে তৈলমর্দন করা। তবে এটার জন্য যে জান-প্রান দিয়ে দেয়, তারা গবেষণায় যদি সময় এর তিন ভাগের ১ ভাগ দিত। তাহলে আমার ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার চিত্র পাল্টে যেত।

একজন শিক্ষকের বুঝা উচিত-শিক্ষকতা একটি ১ম শ্রেণির পেশা, তার আর চাওয়া পাওয়ার কিছু থাকতে পারে না। তাকে মাসে ২ বা ৩ হাজার টাকা বাড়ানোর ভাতা বৃদ্ধির জন্য প্রশাসনিক কর্মকতা হিসেবে ৩য় শ্রেণির পোস্ট নেওয়ার জন্য অনেকের ব্যাকুল হওয়া উচিত কিনা?

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাউকে প্রশাসনিক পদের জন্য যোগ্য মনে করলে কাউকে দিলে সেটি ভিন্ন কথা। তবে আমার জানা মতে, সেটি কখনোই হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ যদি সকল শিক্ষকদের স্বার্থে নেতৃত্ব দিত তাকে অবশ্যই তারা পেশাজীবি হিসেবে এগিয়ে যেত। তারা কখনোই জাতীয়ভাবে অবহেলিত থাকতো না। সেটি না করে ব্যক্তিস্বার্থের পদ-পদবির রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাডেমিক পরিবেশ বিঘ্ন ঘটে। এমনকি জাতীয় রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অংশগ্রহন নাই বললে চলে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আভ্যন্তরীন রাজনীতিকে কেউ রাজনীতি না বলে অপরাজনীতি বলতে পারেন। তবে বর্তমানে প্রেক্ষিতে রাজনীতি শব্দটি সমাজে পজিটিভ নয় এটাও অনেকে বলেন।

৫ মার্চ, ২০২০ইং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গবেষণা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (এনএসটি) ফেলোশিপ এবং বিজ্ঞানী ও গবেষকদের জন্য গবেষণা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘গবেষণা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। তবে শুধু গবেষণা করলেই হবে না। গবেষণার জন্য যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তার ফলাফলটা কী সেটাও জানাতে হবে।” তবে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সবিনয়ে বিশেষ অনুরোধ করছি ফলাফল প্রকাশ বা গবেষণাকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যাতে ফারুক স্যার বা মলয় কান্তি মৃধা স্যারের মতো গবেষকগণ নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে আপনাকে সেটাও নিশ্চিত করাও জরুরি।

তবে এটাও ঠিক অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শুধু গবেষণা করে নিজের পদোন্নতি পাওয়ার জন্য। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্লান্তিহীন আর্টিকেল লিখে যাচ্ছে একের পর এক কিন্তু এটি সমাজে বাস্তবায়নে করেন না; যার ফলে অর্জিত গবেষণার জ্ঞান জনকল্যাণে কাজে লাগছে না। তাই উভয় গবেষকের কাছে সমাজ তথা রাষ্ট্র ব্যবস্থার কাছ থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। তবে কতিপয় পিএইচডিধারী এমন গবেষকও আছে, গবেষণার ধারে কাছেও যান না, দেশ-দশ কিংবা মানবকল্যাণ তো দূরের কথা, নিজের শিক্ষার্থীদের জন্যও এক বিন্দু গবেষণা তারা করেন না।

এটাও সঠিক যে, বিদেশ থেকে অনেক শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রি শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো মানের ল্যাব না থাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের গবেষণায় অর্ন্তভুক্ত করতে পারছে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনও অনেকে গবেষক আছেন, সারাদিন গবেষণা করে এর বাস্তবায়নের জন্য মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। উদাহরনস্বরুপ বলা যায়, আজকে স্ট্রবেরি বাংলাদেশে উৎপাদন করা হচ্ছে। আজকে খাদ্যে যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ, সেটাও কিন্তু গবেষণার ফসল। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি এখন পুষ্টির নিশ্চয়তা নিয়ে কাজ চলছে। মাছ, সবজি উৎপাদনেও আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। এসবই হয়েছে গবেষণার জন্য।

সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের উচিত তাদের গবেষণাকে নিজের কাছে না রেখে এটি জনবান্ধব করা। আসলে কোনো একটি বিষয় কী জন্য সংঘটিত হয়েছে, কীভাবে সংঘটিত হয়েছে, এর পেছনের কারণগুলো কী, এটি কীভাবে মানুষের কল্যাণে কাজ করছে, কোন কোন ধরনের মানুষের কল্যাণে কাজ করছে, কীভাবে এটিকে আরও ব্যাপক কল্যাণের কাজে ব্যবহার করা ইত্যাদির জন্যই কোনো বিষয়ের ওপর গবেষণা প্রয়োজন। সেটি নিজের, পরিবারের, প্রতিষ্ঠানের, দেশের এবং সার্বিকভাবে মানবকল্যাণে কতটা কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সেজন্যই মূলত গবেষণা।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও অনেক ভাল মানের পিএইচডি গবেষক রয়েছে তাদেরকে আমরা গবেষণার অপ্রতুল টাকার জন্য কাজে লাগাতে পারছি না। যার ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও গবেষণায় কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছতে পারছে না। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই নামকাওয়াস্তে গবেষণা পরিচালনা করছে। ২০১৮ সালে চালু থাকা ৩৭ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ছয়টি গবেষণা খাতে কোনো ব্যয়ই করেনি। আর সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত গবেষণায় ব্যয় করেছে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়।

এমনকি ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রকাশনাই নেই। তবে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যতসংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষার্থী আছেন সে তুলনায় গবেষণা খাতে ব্যয় খুবই নগণ্য বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এক বছরে ২০ লাখ টাকা গবেষণায় ব্যয় করা আসলে কোনো গবেষণাই নয়। দেশে মোট বাজেটের শূন্য দশমিক ২ শতাংশ টাকা গবেষণা খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। যা ভালো গবেষণার জন্য অপ্রতুল। গবেষণা মানুষের চিন্তাধারাকে মুক্ত করতে সাহায্য করে। এর সবচেয়ে বড় অবদান মানুষের মধ্যের ধূম্রজাল ও কুসংস্কার দূর করে।

বাস্তবতার নিরীখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অপরাজনীতিমুক্ত করার জন্য গবেষণাধর্মী পিএইচডি ডিগ্রিধারী গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে প্রভাষক পদ বাদ দিয়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী প্রার্থীকে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে তা আছে। সত্যি বলতে কী? বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনোও শিক্ষক নিয়োগে এসএসসি ও এইচএসসির রেজাল্ট জিপিএ ৫ চেয়ে বসে আছি আমরা যা হাস্যকর। কোন আবেদন প্রার্থীর গবেষণার মান দেখা হয় না। এই ব্যবস্থায় আপনি হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারবেন কিন্তু আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারবেন না। আবার ধরেন, আপনার শিক্ষা জীবনে সকল ডিগ্রিতে ফাস্ট ক্লাস কিন্তু রাজনৈতিকভাবে যুক্ত নন। তাহলেও নিয়োগ পাবেন না।

সুতরাং সরকারি কর্তৃপক্ষকেও বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাধর্মী করার জন্যে এগিয়ে আসতে হবে। আর বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে চলছে এভাবে চললে এটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে। এখান থেকে রাজনৈতিক নেতা ও বিসিএস ক্যাডার এবং কিছু বেকার গ্রাজুয়েট তৈরি হবে। কখনোই কোন গবেষক তৈরি হবে না। যার ফলে আমরা করোনায় বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে অবদান রাখছে, আমরা হাত-পা গুটিয়ে পঙ্গুত্ব বরন করে বসে আছি। আগামীতে দেশের ক্রান্তি লগ্নে কোন অবদান রাখতে পারবনা।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্রমবিন্যাস করা লন্ডনভিত্তিক টাইমস হায়ার এডুকেশন নামে এই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সালের এশিয়ার ৪৮৯টি সেরা বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ের তালিকা তৈরি করেছে, তাতে এশিয়ার ৪ শত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালেয়ের নাম নেই। আগামিতে হয়তো ৪ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না এটাই স্বাভাবিক। এটি নিয়ে আমাদের নীতি নির্ধারকদের সকলের ভাবা উচিত।

বাংলাদেশে গবেষণা খাত অবহেলিত। শিক্ষা ও গবেষণা খাত গুরুত্ব পেলে দেশ অনেক এগিয়ে যেত। শিল্পায়ন দ্রুততর এবং এর ভিত্তি মজবুত করতে হলে গবেষণা দরকার। আর গবেষণার পীঠস্থান হলো বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু অর্থাভাবে এবং প্রায়োগিক সাফল্য যাচাইয়ের সুযোগের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা আলোর মুখ দেখছে না। দেশের স্বার্থে গবেষণা কাজে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। গবেষণালব্ধ ফলাফল দিয়ে দেশ ও মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে পারলেই সে গবেষণা সার্থক। আমাদের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা সর্বক্ষেত্রেই গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

আমরা ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করছি, বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছি, আর বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েই আমাদের চলতে হবে। দেশের মানুষ যেন বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে, সেজন্য বিজ্ঞানমনস্কভাবেই আমাদের গবেষণাধর্মী মানবসম্পদ প্রয়োজন।

কোনো জাতি শিক্ষা ও গবেষণায় পিছিয়ে থাকলে সে জাতি অন্যান্য যে কোনো খাতে পিছিয়ে যাবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। সরকারকে অচীরেই শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে-যেন আমরা বিশ্ব দরবারে আপন পরিচয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি।


লেখকঃ শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিশ্লেষক ও ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ এবং সহকারী অধ্যাপক, ম্যানেজমেন্ট এন্ড ফাইন্যান্স বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *