এই সময়েও সম্ভ্রান্ত সাহিত্যচর্চা হচ্ছে, তবে আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি!

এই সময়েও সম্ভ্রান্ত সাহিত্যচর্চা হচ্ছে, তবে আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি!

সাহিত্য ডেস্ক


রহমাতুল্লাহ রাফি এই সময়ের একজন জনপ্রিয় তরুণ কবি ও লেখক। পড়া-শোনা করছেন চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যে চর্চায় সক্রিয় আছেন তমুলভাবে। লেখকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অরণ্যে অন্বেষণ’। নিজকে ‘পাহাড়ি ক্যাম্পাসের যাযাবর’ ভাবা এই তরুণ কবির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- ‘দ্য ক্যাম্পাস টুডে’র সাহিত্য সহযোগী সম্পাদক — নুরুল করিম মাসুম।

‘অরণ্যে অন্বেষণ’ আপনার প্রথম কবিতার বই, এই বইটি যখন মলাটবদ্ধ হয়ে হাতে এসেছিল, তখন আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?

প্রত্যেকের জীবনেই এমন কিছু বিশেষ অনুভূতি থাকে, যা ভাষায় প্রকাশ করার সক্ষমতা মানুষের থাকে না। নিজের বিচ্ছিন্ন লেখাগুলোকে দুই মলাটের মাঝে কাগজের ভাঁজে সহাবস্থানে দেখে আমার অনুভূতির লিরিক ঠিক তেমনই সূক্ষ্ম।

‘অরণ্যে অন্বেষণ’ যখন মলাটবন্দী হয়ে আমার হাতে আসে, সেই আবেগঘন মূহুর্তের সঠিক চিত্রকল্প আঁকতে পৃথিবীর যে কোনো চিত্রশিল্পী ব্যর্থ— শব্দের কী সক্ষমতা যে সেই অনুভূতির পুঙ্খানুপুঙ্খ বয়ান করে?

তবে এতটুকু বলতে পারি, মলাটবন্দী ‘অরণ্যে অন্বেষণ’কে এক নজর দেখতে আমার মন-মননে এক অপরিচিত ঝড়ের উদ্ভব হয়েছিল। জন্মের এতদিন পরেও দেহাবয়ব ‘অরণ্যে অন্বেষণ’কে একটু ছুঁয়ে দিলে আমার হৃদয় জুড়ে ভালোলাগার সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে।

ধারণা করা যায়, এই করোনাকাল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বা যারা সৃষ্টিশীল মানুষ তাদের জন্য এক প্রকার আশীর্বাদ—এই সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

আমি মনে করি, শিল্পীরা হাজার ব্যস্ততার মাঝে একটু একটু সময় খুঁজে যখন তার শিল্পকে গড়ে তুলেন, তখন তা হয়ে ওঠে অনন্য। অঢেল সময় শিল্পীর মস্তিষ্ককে অনুর্বর করে তুলে, তার স্বভাবসিদ্ধ সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। স্বাভাবিকভাবেই সৃজনশীল মানুষ অলস প্রকৃতির হয়ে থাকে, ফলে কর্মহীন বেহিসাব সময় তাদের আলস্য-চিতায় ঘি ঢেলে দেওয়ার মতোই ভয়ঙ্কর। এদিকে বিবেচনা করলে করোনাকালের এই অফুরন্ত সময় কখনই একজন শিল্পীর জন্য আশীর্বাদ নয়। তবে ব্যতিক্রম থাকতে পারে।

পাঠক মহলে পরবর্তীতে কি বই নিয়ে হাজির হবেন?

যেহেতু আমার প্রথম বই ‘অরণ্যে অন্বেষণ’ একটি কাব্যগ্রন্থ ছিল। সুতরাং আমার পরবর্তী বইটি একটি উপন্যাস হলে পাঠক আমাকে নতুন আঙ্গিকে খুঁজে পেত। সেই ভাবনাকে ধারণ করে একটি উপন্যাসে হাত দিয়েছিলাম আমি। উপন্যাসের গল্পটা খুব সরল নয়—তাই ধরে ধরে কাজ করতে হচ্ছে। গল্পের প্রয়োজনে মেডিকেল সায়েন্স সম্পর্কে বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি করতে হচ্ছে। জানতে হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা-বাহিনীর কাজের সুপ্ত ধরন—যা আমার জন্য মোটেই সহজ কিছু নয়।

সুতরাং এরকম একটি কমপ্লিকেটেড স্টোরিকে সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে হলে যথেষ্ট সময় দিতে হবে। সর্বোপরি নানাবিধ ব্যস্ততা এবং রাজকীয় অলসতার কারণে কাজটি থমকে আছে। তবে শুরু যখন হয়েছে শেষ হবেই। আর গোঁজামিল দিয়ে কাজ শেষ করা যেহেতু আমার স্বভাববিরুদ্ধ, সুতরাং তাড়াহুড়া করে পাঠককে কোনো অখাদ্য উপহার দিব না। আমি পরিমাণে নয়; মানে বিশ্বাসি।

ফলে আমার দ্বিতীয় বই উপন্যাস না হয়ে একটি কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে—যার সম্ভাব্য নাম ‘দ্বিতীয় দেখা’। বইটি পাঠকে তৃপ্ত এবং তুষ্ট করবে বলে আমি শতভাগ আশাবাদী। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রকাশনী কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে আগ্রহ দেখিয়েছে। দেশের সম্যক পরিচিত এবং শতভাগ প্রতিশ্রুতিশীল কোনো প্রকাশনী থেকেই ‘দ্বিতীয় দেখা’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ পাবে। ইন-শা-আল্লাহ।

পাহাড়ী ক্যাম্পাসের যাযাবর এবং কবি রহমাতুল্লাহ রাফির মধ্যেকার পার্থক্য কি?

‘পাহাড়ি ক্যাম্পাসের যাযাবর’ আর কবি রহমাতুল্লাহ রাফির মধ্যে আদতে কোনো পার্থক্য নেই। একজন প্রাণ ম্যাঙ্গো জুস, তো অন্যজন ফ্রুটিকা। আপাদমস্তক একজন প্রাণোচ্ছল, হাস্যোজ্জ্বল মানবদেহের নাম রহমাতুল্লাহ রাফি—একই সাথে ভালো এবং খারাপ।

বিপরীতমুখী গুণের এত তীব্রতর সমন্বয় যে, মাঝে মাঝে নিজেই কনফিউজ হয়ে যায় নিজের ডেফিনিশন নিয়ে। তবে যখন সে সাহিত্য নিয়ে ডুবে থাকে ভাবনার অতল গভীরে—বেচারা নাওয়া-খাওয়া ভুলে যায়, ভুলে যায় ঘড়ির পেণ্ডুলামের সঠিক সীমারেখা—তখন তাকে একটা উদ্ভ্রান্ত যাযাবর মনে হতে পারে।

চিন্তাশীল সাহিত্য চর্চা এই সময় তেমন হচ্ছে না, বরং সবাই গতানুগতিক রোমান্টিক জনরা নিয়ে সাহিত্য চর্চা করে যাচ্ছে। সাহিত্যের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একচেটিয়াভাবে প্রেম-ভালোবাসার অশ্লীল উপস্থিতিই কি সাহিত্য? কেন এই সমস্যা? এর মূল কারণ আপনার কাছে কী মনে হয়? এর থেকে উত্তরণের পথ কী?

চিন্তাশীল সাহিত্যচর্চা যে হচ্ছে না, ব্যাপারটা তেমন না; কম করে হলেও হচ্ছে। তবে যারা লাগাতার প্রচেষ্টা করছেন, পাঠক এখন পর্যন্ত তাদের সেভাবে চিনে উঠতে পারেননি। আসলে সাহিত্যের প্রতিটি যুগেই বিবাদমান দুইটি ধারা চলমান ছিল, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাজারি সাহিত্য। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই বাজারি সাহিত্যটা তুলনামূলক পাঠকের দোরগোড়ায় তাড়াতাড়ি পৌঁছায়। রুচিশীল সাহিত্য ঠিক এর বিপরীত।

এই সময়েও সম্ভ্রান্ত সাহিত্যচর্চা হচ্ছে, তবে তা এখনও আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, একটি জাতির রুচির উপর ভর করে সেই জাতির শিল্প-সাহিত্য গড়ে ওঠে। লজ্জাজনক হলেও বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই—আমাদের রুচিবোধ দিনদিন নিম্নদিকে ধাবিত হচ্ছে। ফলে অবধারিতভাবে আমাদের সাহিত্যিকদের উপরেও তার প্রভাব প্রবলভাবে পতিত হচ্ছে। তাদের চিন্তার সংকীর্ণতা সৃষ্টিতে পাঠকদের রুচির দীনতা দায়ী।

গতানুগতিক লুতুপুতু সাহিত্য থেকে বের হতে হলে, লেখকদের আগে আদর্শ পাঠক হতে হবে। বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান রাখতে হবে। পপুলারিটির পিছনে না ছুটে, প্যাশনের পিছনে ছুটতে হবে। একজন লেখক যখন ধী-মেধাসম্পন্ন হবেন, তখনই তার রচনা জাতির দর্পণ হিসেবে কাজ করবে। একজন আদর্শ লেখকের কলম-কালির উদ্ভাসিত আলোতে জাতি এগোতে থাকবে উৎকর্ষের সন্ধানে।

কবিতার মাঝেই কি কবির জীবন বন্দী?

একজন কবি তার চারিপাশের পরিবার-পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকেই কবিতা উদ্গত করে থাকেন। সুতরাং বলা যায়, কবিতার মাঝেই কবির জীবন বন্দী অথবা জীবনের মাঝেই কবির কবিতা লুকিয়ে থাকে।

সাহিত্য-সংসদে নিজেকে কোন আসনে দেখতে চান?

যথেষ্ট বিনয় নিয়েই বলছি, সাহিত্য-সংসদে প্রধানমন্ত্রীর আসনটিতেই নিজেকে দেখতে চাই আমি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *