জিডির পদ্ধতি, নমুনা ও গুরুত্ব

জিডির পদ্ধতি, নমুনা ও গুরুত্ব

মোঃ খায়রুল ইসলাম


১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৪ ধারায় বলা অনুযায়ী পুলিশ স্টেশন হলো ফৌজদারি এখতিয়ারের সর্বনিম্ন ইউনিট যেখানে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণ তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া বা ঘটতে যাচ্ছে এমন সব ঘটনা সম্পর্কে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।

কিন্তু সব ঘটনার জন্য এজাহার দায়ের করা যায় না বা এজাহার হয় না।এমন কিছু অভিযোগ বা ঘটনা যা সাধারণ আকারে ডায়েরিভুক্ত করা হয়ে থাকে যাকে সংক্ষেপে বলা হয় জিডি।

এটি মুলত কোন বিষয়ে থানায় অবহিতকরণ।কোন একটি ব্যাপারে থানায় অবহিত করা হলে থানা সে ব্যাপারটি তার রক্ষিত নথিতে লিপিবদ্ধ করেন।একে বলে জিডি এন্ট্রি।

জিডি এন্ট্রি পুলিশ আইন-১৮৬১ এর ৪৪ ধারা,পুলিশ রেগুলেশন অব বেংঙ্গল-১৯৪৭ এর ৩৭৭ ধারা ও ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ এর ১৫৪ ও ১৫৫ ধারা অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করা হয়ে থাকে।

যেসব কারণে জিডি করতে পারবেনঃ বিভিন্ন কারণে জিডি করা হয়ে থাকে। যেমন, কেউ ভয় দেখালে বা হুমকি দিলে আপনি যদি নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন, তাহলে থানায় জিডি করতে পারেন।

শুধু তাই নয়, কোনো ব্যক্তি বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা থাকলে জিডি করা যায়।এসবের বাইরেও কোনো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, যেমন পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, চেকবই, লাইসেন্স, শিক্ষাসংক্রান্ত সনদ, দলিল, ব্যাংক-চেক, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড, ইত্যাদি হারিয়ে গেলে জিডি করা যায়।

এ ছাড়া কেউ কারো সম্পদের ক্ষতি করলে বা প্রাণনাশের হুমকি দিলে অথবা কেউ ব্লাকমেইল করার চেষ্টা করলে, দলিল হারিয়ে গেলে, বাসার কেউ নিখোঁজ হলে বা পালিয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে জিডি করার দরকার হয়। জিডি করা জরুরি।

কারণ আপনি যদি খারাপ কোনো কিছু আশঙ্কা করেন, ধরুন কেউ আপনার ওপর হামলা করতে পারে বা ক্ষতি করতে পারে, তাহলে জিডি করা হলে ওই ঘটনার পর দোষী ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সহজ হয়।তা ছাড়া হারানো জিনিস খুঁজে পেতেও আপনার জিডি সহায়ক হয়ে ওঠে পুলিশের জন্য।আইনি সহায়তার জন্য জিডি খুবই কার্যকর একটি পদক্ষেপ।

কোথায় জিডি করবেনঃ যে এলাকার মধ্যে ঘটনা ঘটেছে বা তা ঘটার আশংকা রয়েছে, সে এলাকার থানাতেই জিডি করা উচিত।নিজের এখতিয়ারভুক্ত এলাকার থানাকেই প্রাধান্য দেয়া উচিত। অন্যথায় আইনি সহায়তা নিতে ঝামেলা বা হয়রানি বেশি হয়।

জিডি করার পদ্ধতি: প্রথমে এখতিয়ারভুক্ত থানায় গিয়ে থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানাতে হবে জিডি করার ব্যাপারে।তারপর দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা তা শুনে যথাযথ পন্থায় নথিভুক্ত করবেন। জিডি অভিযোগকারী নিজে লিখতে পারেন বা থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্ককর্তাকে দিয়ে লেখাতে পারেন বা কম্পিউটার টাইপ করে জমা দিতে পারেন।

সাধারণত থানার ডিউটি অফিসার জিডি নথিভুক্ত করে থাকেন।একটি ডায়েরীতে তিনি জিডির নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য লিপিবদ্ধ করেন।

জিডির দুটি কপি করা হয়ে থাকে।একটি কপি থানায় সংরক্ষণ করা হয় এবং অন্যটিতে জিডির নম্বর দিয়ে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর ও সীলমোহর দেয়া হয়ে থাকে।এটি ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করতে হয়।

জিডিতে যা যা উল্লেখ করতে হয়ঃ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সম্বোধন করে জিডি লিখতে হবে।
থানার নাম ও ঠিকানা লিখতে হবে।

বিষয়: ‘জিডি করার জন্য আবেদন’ লিখতে হবে। অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা থাকলে জিডিতে তা উল্লেখ করতে হবে। হুমকির ক্ষেত্রে হুমকির স্থান, তারিখ, সময়, সাক্ষী থাকলে তাদের নাম, পিতার নাম ও পূর্ণ ঠিকানা উল্লেখ করতে হবে।

হুমকি প্রদানকারী যদি পরিচিত হয় তাহলে তার/তাদের নাম, পিতার নাম ও পূর্ণ ঠিকানা উল্লেখ করতে হবে।আর অপরিচিত হলে তাদের শনাক্তকরণ বিষয়ে বর্ণনা দিতে হবে।

জিডি নথিভুক্ত করে বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন করতে হবে।সর্বশেষে জিডিকারীর নাম, স্বাক্ষর, পিতার নাম, পূর্ণ ঠিকানা ও তারিখ উল্লেখ করতে হবে।

একটি জিডির নমুনা:

তারিখঃ——
বরাবর,
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
—————–থানা, ঢাকা।
বিষয় : সাধারণ ডায়েরি ভুক্তির জন্য আবেদন।

জনাব,
আমি নিম্ন স্বাক্ষরকারী নাম:———-
বয়স :————————
পিতা/স্বামী : —————————
ঠিকানা : —————————————
এই মর্মে জানাচ্ছি যে আজ/গত ——– তারিখ ——— সময় ———-জায়গা থেকে আমার নিম্নবর্ণিত কাগজ/মালামাল হারিয়ে গেছে।

বর্ণনা : (যা যা হারিয়েছে)

বিষয়টি থানায় অবগতির জন্য সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করার অনুরোধ করছি।

বিনীত,
নাম:
ঠিকানা:
মোবাইল নম্বর:

কিভাবে অনলাইন জিডি করবেন: প্রয়োজনে অনলাইনেও জিডি করা যেতে পারেবেন। এক্ষেত্রে সরাসরি পুলিশ সদরদপ্তরের ফ্যাক্স বা ই-মেইলে যোগাযোগ করা যায়। এ পদ্ধতিতে থানায় যেতে সম্ভবপর না হলে বা দেশের বাইরে থেকেও জিডি করা সম্ভবপর হয়। অনলাইনে জিডি করা হলে ই-মেইল বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জিডি নম্বরটি জিডিকারীকে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

জিডির তদন্তঃ থানায় যে জিডি করা হয় তা কোন কোনো আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটন সম্পর্কে হলে থানা কর্তৃপক্ষ সাথে সাথেই বিষয়টি আমলে নিয়ে অপরাধটি প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। বিষয়টি আমল অযোগ্য হলে সে থানা অবশ্যই প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ সাপেক্ষে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবেন।এ ব্যাপারে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৫ ধারায় বিস্তারিত বলা আছে।

জিডির গুরুত্ব: আইনগত সহায়তা লাভের বিষয়টি নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে জিডি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।শুধুমাত্র একটি জিডির উপর ভিত্তি করেই একটি মামলার শুরু হতে পারে অথবা অপরাধের আশংকা থেকে একটি জিডি করার পর সে অপরাধটি সংঘটিত হলে আদালতে ওই জিডি সাক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হতে পারে।নিজেকে বিভিন্ন আপদ-বিপদ থেকে রক্ষার্থে সাহায্য করে।

তাই জিডির আইনগত গুরুত্ব অনস্বীকার্য।থানায় জিডি করার পর জিডির নম্বরটি অবশ্যই নিজের সংগ্রহে রাখতে হবে।প্রয়োজনে জিডির রিসিভ কপি সংগ্রহ করে রাখতে হবে।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *