ধর্ষণের জন্য চাই জিরো টলারেন্স নীতি

ধর্ষেণের জন্য চাই জিরো টলারেন্স নীতি

শফিকুল ইসলাম


বাংলাদেশে বর্তমান সমাজ পেক্ষাপটে সবচেয়ে উৎকণ্ঠার বিষয় হলো ধর্ষণ।এটি অতি পরিচিত শব্দ। প্রতিদিন কোনো না কোনো স্থানে ধর্ষণ হচ্ছে আমাদের মা ও বোনেরা। এর থেকে বাদ নেই কোনো বয়সের নারীরা।ধর্ষণের কড়াল গ্রাস থেকে রেহাই পাচ্ছে না পাঁচ বছরের কোমলমতি শিশু থেকে পঞ্চাশোর্ধ বছরের মহিলারাও। যা সমাজের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক দিক। ধর্ষণ সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে যা আজ করোনা ভাইরাস মহামারিকেও হার মানায়।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানাচ্ছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত গড়ে প্রতিমাসে দেশে ১১১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। আসক আরও জানিয়েছে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৮৮৯টি। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা কিংবা পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৪১টি।

তথাপি তারা বিশ্লেষণ করে এটাও বলছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বাড়ছে ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা। ২০১৮ সালে এমন ঘটনা ঘটেছে ৭৩২টি। অথচ ২০১৯ সালে প্রায় দ্বিগুণ তথা ১ হাজার ৪১৩টি ঘটনা ঘটেছে।

অন্যদিকে ডয়েচে ভেলে ইতিমধ্যে বিবৃতি দিয়েছে, বিদেশি সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশে ধর্ষণের হার প্রতি লাখে ১০ জন। যে ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৪০তম।

অতি সম্প্রতি ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটে এমসি কলেজে গণধর্ষণের পাশাপাশি নোয়াখালীতে এক নারীকে ধর্ষণ করে উলঙ্গ ভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অপ্রীতিকর ভিডিও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।যেটি ভাইরাল হয়েছে এবং বিভিন্ন যায়গায় মানববন্ধন করেছেন ছাত্রছাত্রী ও সুশীলসমাজের সদস্যরা এবং বিশেষ করে রেপিস্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ প্রোফাইলে ছবি দিয়ে প্রতিবাদ করছে।

নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক কর্তৃক ছাএী ধর্ষণ, ইবি শিক্ষার্থী তিন্নীকে ধর্ষণ করে হত্যা, ,জগন্নাথপুরে সৎ বাবা কর্তৃক মেয়েকে ধর্ষণ অভিযোগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া জানা অজানা, অগোচরেও অসংখ্য মা বোনেরা ধর্ষিত হচ্ছে। যা আজ রীতিতে পরিণীত হয়েছে।

ধর্ষণের মুল কারণ হলো নগ্নতা, অতৃপ্ত যৌন আকাঙ্ক্ষা, বেহায়াপনা, অবাধ যৌনাচার, রাস্তার পাশে দেয়ালে নগ্ন পোস্টার, ফুটপাতে অশ্লীল ছবি সম্বলিত যৌন উত্তেজক অবৈধ বইয়ের রমরমা ব্যবসা, অশ্লীল পত্রপত্রিকা, অশ্লীল ছায়াছবি প্রদর্শন, ব্লু-ফিল,মেয়েদের ওড়নাবিহীন বেপরোয়া চলাফেরা, বাংলা চলচ্চিত্রে খলনায়ক কর্তৃক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণের দৃশ্যের মাধ্যমে সমাজে রাস্তাঘাটে বাস্তবে ধর্ষণ করার উৎসাহ যোগান, ইন্টারনেটে অশ্লীল সাইটগুলো উন্মুক্ত করে দেয়া, প্রেমে ব্যর্থতা, টুয়েন্টি প্লাস চ্যানেলে নীল ছবি প্রদর্শন ইত্যাদি কারণে আজ যুব সমাজের মধ্যে দিন দিন ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্ষণের আরও একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেলেও ছেলে-মেয়েকে বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে অভিভাবকদের উদাসীনতা একাকীত্ব বোধ, অক্ষমতাবোধ, রাগ, অপমানজনক অনুভূতি, হতাশা, ব্যর্থতা বা ব্যক্তিজীবনে কষ্ট, অপ্রাপ্তি এসব থাকলে ধর্ষণের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ৯(১) ধারায় ধর্ষণের জন্য একমাত্র শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। এছাড়া ধারা ৯(৪)(ক) ধারায় ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা বা আহত করার চেষ্টা জন্য একমাত্র শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। এছাড়া ১১(ক) ধারায় যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানোর একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টার জন্য যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। যা সংবিধান পরিপন্থী। একমাত্র সাজা নির্ধারণ করার মাধ্যমে আদালতের বিচারিক এখতিয়ারকে খর্ব করা হয়েছে। এটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী।

মহামারীর মতো জেঁকে বসা এই ব্যাধি দূর করতে আমাদের করণীয় কি? প্রথমত, এই সামাজিক ব্যাধি দূরীকরণে সবার আগে দরকার সম্মিলিত সদিচ্ছা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলাগুলো বিচার করতে হবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। ধর্ষকরা দেশ ও সমাজের জন্য বিষফোঁড়া। রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনকে ধর্ষকদের ব্যাপারে হতে হবে জিরো টলারেন্স। বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের সঙ্গে মৃত্যু না হলে মৃত্যুদণ্ড নেই। শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়।

ধর্ষণের জন্য মেয়েদের পোশাক অনেকটাই দায়ী কিন্তু অনেকে প্রশ্ন করে বসবেন দুই বছরের শিশু কেন ধর্ষণের শিকার হচ্ছে এর প্রধান কারণ যেখানে পর্ণগ্রাফির ছড়াছড়ি, বেহায়াপনা, অবাধ যৌনাচার, রাস্তার পাশে দেয়ালে নগ্ন পোস্টার, ফুটপাতে অশ্লীল ছবি সম্বলিত যৌন উত্তেজক অবৈধ বইয়ের রমরমা ব্যবসা, অশ্লীল পত্রপত্রিকার ছড়াছড়ি সেখানে বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ অনেকসময় প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর ধর্ষণে না পেয়ে থেকে চাহিদা মিটাতে না পেরে দুই বছরের শিশু এমনকি প্রতিবন্ধীর সাথে ধর্ষণ করতে দ্বীধাবোধ করে না।

সমাজ থেকে ধর্ষণ নামক শব্দ মুছতে হলে দরকার আইনের সঠিক প্রয়োগ,নৈতিক শিক্ষা,ধর্মের কঠোর প্রয়োগ। এছাড়া ওয়েবসাইটে পর্ণ-সাইট গুলা চিরতরে মুছে দিতে হবে তাহলে সমাজে ধর্ষণ কমবে আশা করা যায়। একটি রাষ্ট্রের মুল উপাদান চারটি যেমন জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব।এগুলা ছাড়া যেমন রাষ্ট্র চলতে পারে না তেমনি পারিবারিক শিক্ষা,ধর্মীয় মূল্যবোধ,উগ্রজাতীয় বাদ, দুর্বল পারিবারিক বন্ধন,সুশানের অভাব থাকার কারণে সমাজে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে।

এছাড়া আমাদের সমাজে বিয়ে ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে কিন্তু যথাসময়ে ছেলে মেয়েদের বিয়ে না দেওয়ার কারণে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠছে পরবর্তীতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে সমাজে অহরহ।তাই ছেলে-মেয়েদেরকে যথাসময়ে বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।সমাজে সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে এই হীন কাজের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছার হতে হবে।সবাই সচেতন হলে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি দোষীরা যেন শাস্তি পায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে আশা করা যায়।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য,বাংলাদেশ তরুণ লেখক ফোরাম।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Leave a Comment