প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা প্রচার বিমুখ আ. লীগের ‘খোকা ভাই’

মোঃ মেজবাহুল ইসলাম


খােকা, তাের ওপর আমি নির্ভর করি। তুইতাে জানিস, যে জীবন আমি বেছে নিয়েছি তার কোনাে নিশ্চিত স্থিতি নেই, কখন কোথায় থাকি। জানি আমার বহু আত্মীয় আছে, আছে অসংখ্য সুহৃদ, অগণিত ভক্ত কিন্তু তােকেই আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ মনে হয় । তাের ওপরই দিয়েছি তাের ভাবী আর আমার দেখাশুনার ভার। সেই নির্ভরতা— “খােকা, তুই এদেরকে দেখিস।”

উপরোক্ত উক্তিটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তাঁর ফুফাতো ভাই মমিনুল ইসলামের কাছে আকুতি ছিল।

মমিনুল ইসলাম যিনি খোকা নামেই সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করছিলেন কারণ বঙ্গবন্ধু তাঁকে আদর করে খোকা ডাকতেন। সেই ১৯৪৬ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির ছায়াসঙ্গী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের প্রায় প্রত্যেকটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন মমিনুল ইসলাম খোকা।

বঙ্গবন্ধুর পরিবারের চরম দুর্দিনে একমাত্র ভরসা ছিলেন তিনি।বঙ্গবন্ধু যখন তাঁর পরমাত্মীয়র বাসা অর্থাৎ জেলে যেতেন তখন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের হাতের লাঠি ছিল খোকা। ১৯৫৩ সনের দিকে বঙ্গবন্ধু ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে ঢাকায় এসে সর্বপ্রথম খোকার বাসাতেই উঠেন। এরপর বঙ্গবন্ধু মন্ত্রীত্ব পেলে সরকারি বাসভবনেও উঠেন। ৩২ নম্বরের বাসা তৈরি হওয়ার আগে প্রায়ই বেগম মুজিবকে নিয়ে তাঁর বাসা পরিবর্তন করতে হত।

১৯৬৭ সালে আজকের প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার বিবাহের কাজের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল খোকার প্রতিই।১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁর গাড়িতে করেই আসেন। ৭১ এর অগ্নিঝরা মার্চে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎকালেও বঙ্গবন্ধুর পাশেই থাকতেন মমিনুল ইসলাম খোকা।

৭১ এর ২৫শে মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করলে শেখ পরিবারে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। সেই দুঃসময়ে খোকা বেগম মুজিবকে নিয়ে ঢাকার এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি এভাবেই দিন কাটাচ্ছিল। ৭১ এর ২৭শে জুলাই শেখ হাসিনা পুত্র সন্তান জন্ম দেন এ কথা খোকা বেগম মুজিবকে জানানোর সাথে সাথেই বেগম মুজিব তাঁর নিজের হাতের আংটি খোকাকে দেন।

৭১ এর ৫ই আগস্ট শেখ জামাল ১৮ নম্বর রোডের বাড়ির দেয়াল টপকিয়ে পালালে খোকার প্রতি চরম ক্ষিপ্ত হন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং তাঁকে হত্যার আদেশ দেন এক ক্যাপ্টেনকে। সেই ক্যাপ্টেন তাঁকে হত্যার জন্য গোপনীয় জায়গায় নিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ একটি ফোন আসলে ক্যাপ্টেন খোকাকে জড়িয়ে ধরে বলেন “তুম বাচ গায়ে খোকা সাহেব, তুম বাচ গ্যায়ে।” খোকার সহজ সরলতার কাছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীও দুর্বল ছিল।

স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে থাকা চাটুকার ও তেলবাজদের কারণে অভিমানেই স্বদেশ ত্যাগ করে লন্ডনে পাড়ি জমান। তবে মাঝে মাঝেই দেশে আসতেন।৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যার প্রতিবাদে সুদূর লন্ডনেই আন্দোলন চালিয়ে যান।তখন প্রায় প্রবাসী আওয়ামী লীগের নেতারা বৈঠক করতেন কিভাবে বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদীদের হাত থেকে করা যাবে, কার নেতৃত্বে করতে করা যায় ইত্যাদি।

উপস্থিত প্রায় সকলের ভরসা তখন ড.কামাল হোসেন।কিন্তু খোকা সাহেব বলে উঠলেন সামরিক জান্তাদের পতনের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন শেখ হাসিনা,একথা শুনে প্রায় সকলেই দ্বিমত পোষণ করে বলেন,হাসিনার তো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই কিন্তু খোকা সাহেব জোর দিয়েই বলেন হাসিন ইডেন কলেজে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত ছিল এবং সেখানকার নির্বাচিত ভি.পি ছিল।

১৯৭৬ সালে শেখ রেহেনা লন্ডনে আসলে সে তাঁর প্রিয় খোকা কাকার বাসাতেই উঠে। কিছুদিন পর খোকা সাহেবের অভিভাবকত্বে শেখ রেহেনার আকদ সম্পন্ন হয়।এছাড়া দিল্লিতে প্রায় শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে যেতেন ও তাদের আর্থিক ও মানসিকভাবে সার্পোট দিতেন।

মমিনুল ইসলাম খোকা বঙ্গবন্ধুর ড্রাইভার, রাজনৈতিক সফরসঙ্গী, বিশ্বস্ত সহচর ছিলেন।তৎকালীন সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত সকল কর্মসূচিতে তাঁর সরব উপস্থিতি ছিল। ক্ষমতার লোভ তাঁর কখনোই ছিল না। অফুরন্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার মোহ তাঁকে টানেনি। সারাজীবন সাদামাটা জীবনযাপন করে গেছেন।

২০১৪ সালের ২৩শে মে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন প্রচার বিমুখ আওয়ামী লীগের খোকা ভাই। তাঁর এই মৃত্যুদিবসে মহান আল্লাহতায়ালা নিকট আর্জি আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করেন। আমিন।

জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু।


লেখকঃ সহ-সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Leave a Comment