বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন জয়ের সারথি ছিলেন বঙ্গমাতা

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন জয়ের সারথি ছিলেন বঙ্গমাতা

মঞ্জুরুল ইসলাম আকন্দ


বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে, সুখে দুঃখে, দেশ গঠনের ভূমিকায় যার নাম উচ্চারিত হয় তিঁনি হলেন বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

তিনি হলেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী। তিনি শুধু জাতির জনকের সহধর্মিণী’ই নন, তিনি হলেন বাঙ্গালীর মুক্তি সংগ্রামে অন্যতম এক নেপথ্য অনুপ্রেরণা দাত্রী।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের’ ৯০তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৩০ সালের ৮ আগষ্ট, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া ( তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা ) জন্মগ্রহণ করেন এই মহীয়সী নারী। পিতা শেখ মোহাম্মদ জহুরুল হক এবং মাতা হোসেন আরা বেগম। মাএ ৩ বছরে বয়সে মারা যান বাবা (শেখ মোহাম্মদ জহুরুল হক)।

বাবার মৃত্যুর দু’বছরের মাথায় হারান মা ( হোসেন আরা বেগম) কে । বাবা-মা কে হারানোর পর শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বেড়ে উঠেন দাদা শেখ কাশেমের কাছে এবং মাতৃস্নেহে আগলে রেখেছেন চাচী । মাএ ১৩ বছর বয়সে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন শেখ ফজিলাতুন্নেছা। তাঁর আদরের নাম ছিলো রেণু।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যখন কথা বলা হয় তখন প্রচ্ছন্নভাবে চলে আসে বঙ্গমাতার নাম। খোকা থেকে মুজিব, মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং সর্বশেষে বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি হলেন স্বপ্নজয়ের সারথি। ছায়ার মত অনুসরণ করেছেন স্বামী বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে। জাতির পিতার রাজনৈতিক জীবনের ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণের সঙ্গে বঙ্গমাতা ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত ।

”কোন কালে একা হয়নি কো জয়ী পুরুষের তরবারি,
শক্তি দিয়াছে প্ররণা দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী”
‘কাজী নজরুল ইসলামের’ কবিতার এই দুটি লাইনের তাৎপর্য এক সত্যিকারের রূপ ধারণ করেছিলো এবং বাস্তবেও অনেকের মধ্যে তা প্রতীয়মান লক্ষ্য করা যায়।

১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জন বাঙ্গালি নৌ ও সেনাবাহিনীর সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরোদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় বঙ্গবন্ধু বিচলিত না হয়ে আইনিভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহনের জন্য আইনজীবীদের অর্থ জোগানের জন্য নানা ভাবে চেষ্টা করেন। মামলায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলে বঙ্গবন্ধু সহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে বাঙ্গালী রাস্তায় নামে।

রাজনৈতিক উত্তাল পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে হুমকি দেয়। আন্দোলনের বেগবানতা দেখে কার্যত পাকিস্তানি সরকার পিছু হটতে শুরু করে। আর এ সময় পাকিস্তানি সরকার লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহনের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে প্যারোল মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্যারোলে মুক্তির সিদ্ধান্তে জোরালো আপত্তি জানান ফজিলাতুন্নেছা এবং প্যারোলে মুক্তির সিদ্ধান্তে বেঁকে বসেন।

পূর্ব-পাকিস্তানের আন্দোলন দেখে তিঁনি বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তানি সরকার বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি নয়; নিঃর্শত মুক্তি দিতে বাধ্য হবে। তিঁনি বঙ্গবন্ধুর সাথে কারাগারে দেখা করেন এবং বঙ্গবন্ধুকে বৈঠকে অংশ নিতে নিষেধ করেন।

বাঙ্গালি ঐক্যবদ্ধ আছে এটিও তিনি বঙ্গবন্ধুকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফজিলাতুন্নেছার পরামর্শে বঙ্গবন্ধু অনড় থাকেন এবং বিশ্বাস করেন পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হবে। আর এরই মধ্যে শেখ মুজিবুরের মুক্তি আন্দোলন সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে এবং গনঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

গনঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী মুক্তি লাভ করেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারী শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়ে বরণ করে নেয় বাঙালিরা। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে প্যারোলে মুক্তি না নেওয়ার শেখ ফজিলাতুন্নেছার এই সিদ্ধান্ত যেকোন মাপকাঠিতে অনন্য বলে স্বীকৃত হবে।

সর্বগুনে গুণান্বিত ফজিলাতুন্নেছার সাহায্য ও সহযোগিতা না পেলে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে রাজনীতি করা সম্ভব হত না। বেগম মুজিব তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে কাটিয়েছেন।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলো স্বপ্ন জয়ের সারথী। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গমার নাম চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
জন্মদিনে মহীয়সী নারীর প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক: শিক্ষার্থী, মাৎস্য বিজ্ঞান বিভাগ, বশেফমুবিপ্রবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *