‘শতভাগ সাক্ষরতা’ কতদূর!

‘শতভাগ সাক্ষরতা’ কতদূর!

মো: রুবাইয়াদ ইসলাম


আজ ৮ই সেপ্টেম্বর, ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় ১৭নভেম্বর, ১৯৬৫ সালে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও সমাজে সাক্ষরতার গুরুত্ব তুলে ধরা।

এ দিবসটি পালনের মাধ্যমে সারাবিশ্বের মানুষকে তারা বলতে চায় সাক্ষরতা একটি মানবিক অধিকার এবং সর্বস্তরের শিক্ষার ভিত্তি। সাক্ষরতা দিবসের এ বছরের বিশেষ প্রতিপাদ্য হলো:
‘‘কোভিড-১৯ সংকট: সাক্ষরতা শিক্ষায় পরিবর্তনশীল শিখন-শেখানো কৌশল এবং শিক্ষাবিদদের ভূমিকা”।

সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও দিনটি যথাযোগ্যভাবে পালন করা হয়। এই দিনটি উপলক্ষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কতৃক বিশেষ বাণী প্রকাশিত হয়।

সাক্ষরতা আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত মানবীয় অধিকার হিসেবে বিশ্বে গৃহীত হয়ে আসছে। এটি ব্যক্তিগত ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক ও মানবীয় উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণযোগ্য। এমনকী শিক্ষার সুযোগের বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করে সাক্ষরতার ওপর। সাক্ষরতা মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি হিসেবেও কাজ করে। দারিদ্র্য হ্রাস, শিশু মৃত্যু রোধ, সুষম উন্নয়ন এবং শান্তি ও সমৃদ্ধি বিকশিতকরণের ক্ষেত্রেও সাক্ষরতা প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হিসেবে গণ্য হয়। মূল কথা সবার জন্য শিক্ষা।

এ স্লোগান বাস্তবায়ন করতে সাক্ষরতাকে ভিত্তি হিসেবে মনে করার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। একটি মানসম্মত মৌলিক শিক্ষা মানুষকে সাক্ষরতা ও দক্ষতার সঙ্গে তৈরি করতে সহায়তা করে। সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মা-বাবা তাঁদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে প্রেরণে উৎসাহিত হন, অব্যাহত শিক্ষায় নিজেকে প্রবেশ করতে উৎসাহ পান এবং উন্নয়নের দিকে দেশকে ধাবিত করার ক্ষেত্রে সচেষ্ট ও সরকারকে চাপ প্রয়োগে সাহায্য করে থাকেন।

দেশে দেশে সাক্ষরতার সংজ্ঞা অনেক আগে থেকে প্রচলিত থাকলেও ১৯৬৭ সালে ইউনেস্কো প্রথম সাক্ষরতার সংজ্ঞা চিহ্নিত করে এবং পরবর্তী সময়ে প্রতি দশকেই এই সংজ্ঞার রূপ পাল্টেছে। এক সময় কেউ নাম লিখতে পারলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো, কিন্তু বর্তমানে সাক্ষর হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য অন্তত তিনটি শর্ত মানতে হয়। ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে পারবে, সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারবে এবং দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসাবনিকাশ করতে পারবে।

এই প্রত্যেকটি কাজই হবে ব্যক্তির প্রাত্যহিক জীবনের সাথে সম্পর্কিত। সারা বিশ্বে বর্তমানে এই সংজ্ঞাকে ভিত্তি করে সাক্ষরতার হিসাব-নিকাশ করা হয়। ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কো এই সংজ্ঞাটি নির্ধারণ করে; তবে বর্তমানে এটিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক ফোরাম বা কনফারেন্স থেকে সাক্ষরতার সংজ্ঞা নতুন ভাবে নির্ধারণের কথা বলা হচ্ছে যেখানে সাক্ষরতা সরাসরি ব্যক্তির জীবনযাত্রা পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত হবে।

সাক্ষরতার বহুবিধ ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। শুধু সাক্ষরতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তিই নয়; বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক মুক্তি আনয়নের মাধ্যমে প্রাত্যহিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এর লক্ষ্য। কেননা সাক্ষরতা শান্তি স্থাপনে অবদান রাখে এবং মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করে। শুধু তা-ই নয়, বিশ্ব সম্পর্কে ভালো ধারণা অর্জনেও সাক্ষরতা কাজ করে।

যিনি লিখতে ও পড়তে পারবেন, এক মাত্র তিনিই জানবেন দেশ ও দেশের বাইরে কোথায় কী ঘটছে। এটি এমন একটি মাধ্যম, যা পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত নিরসন এবং প্রতিরোধেও সহায়তা করে। সাক্ষরতার সঙ্গে শান্তির সম্পর্ক বা যোগাযোগ এতটাই বেশি যে অস্থিতিশীল, অগণতন্ত্রকামী এবং সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোতে সাক্ষরতার পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত করা কিংবা বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের হিসাবে দেশে তখন পর্যন্ত গড় সাক্ষরতার হার ৭৩.৯০ শতাংশ। গত ৬ই আগস্ট,২০২০ (রোজ রবিবার) তারিখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৪.৭০ শতাংশ। সেই হিসাবে এক বছরে সাক্ষরতার হার বেড়েছে ০.৮০ শতাংশ।

গণসাক্ষরতা অভিযান ২০১৬ সালে সাক্ষরতার হার নিয়ে সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, সাক্ষরতার হার ৫১.৩০ শতাংশ। বর্তমানে বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) কোনো জরিপ না থাকলেও বেসরকারি হিসাবে সাক্ষরতার হার প্রায় ৬০ শতাংশ বলে মত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কায় সাক্ষরতার হার প্রায় ৯২ শতাংশ। ভারতেও কেরালাসহ কিছু রাজ্যে সাক্ষরতার হার ৯০ শতাংশের ওপরে। তবে তাদের গড় হার প্রায় ৭৪ শতাংশ। নেপাল, ভুটানসহ আশপাশের দেশে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭০ শতাংশ।

সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত গতকালের সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২১ লাখ নিরক্ষরকে সাক্ষরতা প্রদানের কার্যক্রম চলমান আছে।

পিইডিপি-৪-এর আওতায় আট থেকে ১৪ বছর বয়সী বিদ্যালয়বহির্ভূত ১০ লাখ শিশুকে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসডিজি-৪ অর্জনের লক্ষ্যে নন-ফরমাল এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রগাম নামে একটি কর্মসূচিভিত্তিক প্রকল্প প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হয়েছে।

লেখক: শিক্ষার্থী,
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *