মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২২, ০৮:১৭ অপরাহ্ন

সুবর্ণজয়ন্তীতে রাবিতে ধর্ষণ মামলার আসামীর জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা

  • আপডেট টাইম রবিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২১, ১১.৩৬ পিএম

ওয়াসিফ রিয়াদ, রাবি: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন ধর্ষণ মামলার আসামী রকিবুল হাসান রবিন। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীর অভিভাবক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।

রবিন শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের (টিএসসিসি) উপ-পরিচালকের (সংগীত) দায়িত্ব পালন করছেন।

বিজ্ঞাপন

গত বছর ২৩ আগস্ট রবিনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর করা একটি লিখিত অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেয় তার পরিবার। অভিযোগপত্রে ওই শিক্ষার্থী উল্লেখ করেন, তিনি রকিবুল হাসান রবিনের কাছে গান শিখতেন। ২০১০ সালে ১২ বছর বয়সে তাকে ধর্ষণ করেন রবিন। এরপর বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেন। এতে তার মানসিক অবস্থার পাশাপাশি পড়াশোনা ও সামাজিক জীবন ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ন্যায়-অন্যায় বোধ, অকপটে বলার সাহস এবং সামাজিক সমর্থন না পাওয়ার আশঙ্কায় সে সময় তিনি ঘটনা প্রকাশ করতে পারেননি বলে উল্লেখ করেন ভুক্তভোগী।

এ ঘটনায় পরে ভুক্তভোগীর বাবা বাদী হয়ে রাজশাহী নগরের মতিহার থানায় রবিনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পর জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং রাজশাহী জেলা পরিষদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। এর কিছুদিন পর ইলামিত্র শিল্পী সঙ্ঘ থেকেও বহিষ্কৃত হন রবিন।

বিজ্ঞাপন

ধর্ষণ মামলার আসামী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত হলেও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনসহ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কতটুকু যৌক্তিক; এমন প্রশ্ন তুললছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মা। পাশাপাশি অনতিবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় এই অভিযোগটি উত্থাপনের জোর দাবি জানান তিনি।

ভুক্তভোগীর মা জানান, ওই ঘটনায় আমরা মামলা করেছিলাম। যা এখনো বিচারাধীন রয়েছে। দীর্ঘ তদন্তের পর পুলিশ তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে। শুনেছি তিনি এখন জামিনে রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিলো। সেই তদন্ত প্রতিবেদনও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযোগ সেলে জমা দেয়া হয়েছে। সাবেক উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হবার আগেই একটি সিন্ডিকেট সভায় এটি সমাধানের কথা থাকলেও সেটা হয়ে ওঠেনি। পরে নতুন মেয়াদে উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণ করার পর দুইটি সিন্ডিকেট সভা সম্পন্ন হলেও এই বিষয়টি উত্থাপন হয়নি।

বিজ্ঞাপন

একজন ‘ধর্ষকেরর’ অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পর্বে অংশ নেয়া বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অবমাননার সামিল উল্লেখ করে তিনি এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সিনিয়র অধ্যাপক বলছেন, ধর্ষণের অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুতর। এটি শুধু অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে। আশা করি খুব দ্রুতই এ ঘটনার রায় প্রকাশ করবেন আদালত। ধর্ষণের অভিযোগ থাকার পরও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশে অভিযুক্ত সেই ব্যক্তির অংশগ্রহণ অবশ্যই বঙ্গবন্ধুকে অবমাননার সামিল।

বিজ্ঞাপন

ধর্ষণের ঘটনায় জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির হয়ে তদন্তে অংশ নেন বিশ্বিবদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবা কানিজ কেয়া।

তিনি বলেন, ধর্ষণের মত একটি গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশে কীভাবে অংশগ্রহণ করেন সেটা আমার বুঝে আসে না। ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত রবিনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ভুক্তভোগীর পরিবার। নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় কার্যক্রম থেকে তাকে সাসপেন্ড করার উচিত ছিলো। কিন্তু তা না করে এ ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে আরও সম্মানিত করেছেন।

বিজ্ঞাপন

ধর্ষণের ঘটনাটি জনসম্মুখে আসার পর রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এতে আমি সক্রিয়ভাবে কাজ করি। তদন্ত প্রতিবেদনে ধর্ষণের ঘটনাটি প্রমাণিত হলে সংগঠন তাকে বহিষ্কার করে এবং এর কপি আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন দমন সেলে জমা দেই। প্রতিবেদনটি অভিযোগ সেলে পৌঁছেছে বলে আমি জানতে পারি, তবে এখন পর্যন্ত কোন সিন্ডিকেটে সেই অভিযোগটি উত্থাপন হয়নি বলে যোগ করেন অধ্যাপক কেয়া।

এ বিষয়ে শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক আরিফ হায়দার বলেন, আমি এ বিষয়ে অবগত রয়েছি। এ বিষয়ে মামলাও প্রক্রিয়াধীন। কিন্তু মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা তাকে দায় দিতে পারি না। যেহেতু তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনভুক্ত একজন কর্মকর্তা, তাই তিনি দায়িত্ব পালন করবেন এটাই স্বাভাবিক।

বিজ্ঞাপন

ধর্ষণের ঘটনাটি সিন্ডিকেট সভার আলোচনায় উত্থাপিত না হওয়ার পিছনে কোনো কারণ আছে কি না জানতে চাইলে কথা বলতে অসম্মতি প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার।

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, আমি বিষয়টি গতকালই জেনেছি। এটা আগের মেয়াদে থাকা উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহান স্যারের সময়কার ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে আমি উপাচার্য স্যারের সাথে কথা বলব, যাতে করে এ ঘটনার একটি সুষ্ঠু সমাধান হয়।

বিজ্ঞাপন

The Campus Today YouTube Channel

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
themesbazar_creativenews_II7
All rights reserved © 2019-20 The Campus Today