কোভিড-১৯ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ড. মোছা. ফেরদৌসী বেগম


বৈশ্বিক মহামারী COVI-19 এর আজ দুইশত বিশতম দিন। অবরুদ্ধ পৃথিবীবাসী আজ মুক্তি চায়। কিন্তু চাইলেই কি মুক্তি মেলে! বিশ্বায়নের যাত্রায় আজ শুধু আমার বলে কিছু নাই, সবই গ্লোবাল। তাই এ সময়ের মহামারী কোভিড-১৯ ও গ্লোবাল হয়েছে। চীন থেকে শুরু হলে ও এর ব্যাপ্তি এখন পৃথিবীময়।

ইতিহাস বলে পৃথিবীতে সৃষ্ট প্রথম মহামারী ঘটেছিল চীনের হামিন মাঙ্গাতে ৫ হাজার বছর আগে। তখন চীনের ঐ একটি গ্রামের উনত্রিশটি পরিবারের দুইশত জনের সবাই মারা গিয়েছিল যা আজও পরিত্যাক্ত গ্রাম হিসেবে আছে। সেখানে কেউ বাস করে না।

মনে করা হয় যে এই জীবানুটি সিল্ক রুট অথবা সমুদ্রপথের মাধ্যমে যে বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক তৈরী হয়েছিল বা পৃথিবীতে প্রথম বিশ্বায়নের যে যাত্রা হয়েছিল তার মাধ্যমেই এশিয়া থেকে ইউরোপে পৌঁছে। বিশেষ করে মসলা ও শস্য যখন বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তার সাথে রডেন্ট বা ইঁদুর জাতীয় প্রাণী এই জীবানুটি নিয়ে যায়। ষষ্ঠ শতকে জাস্টিনিয়ান প্লেগ বা প্রথম বিউবুনিক মহামারী ঘটেছিল তাI এই জীবানু দ্বারা।

এদের মধ্যে জিনগত সাদৃশ্যও আছে। এই জীবানুটি রোমান সম্রাজ্যের ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল। ধবংস করেছিল রোমের আর্থ-সামাজিক ব্যাবস্থা। চতুর্দশ শতকেও একই জীবানু ব্ল্যাক ডেথ বা বিউবুনিক প্লেগ ঘটিয়েছিল এবং এ মহামারীতে পৃথিবীতে দুইশত মিলিয়ন মানুষ মারা যায়।

এ মহামারীর ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে লাশ সৎকারের লোক পাওয়া যেত না। এটি পুরো ইউরোপের ইতিহাস পাল্টে দিয়েছিল। সপ্তদশ শতকের ইটালিয়ান প্লেগ ও লন্ডন প্লেগ নামে আরো দুটি মহামারী দেখা যায়। লন্ডন প্লেগের ভয়াবহতা এত বেশি ছিল যে ডাক্তার, বিভিন্ন পেশাজীবির মানুষরা শহর থেকে পলায়ন করতে থাকে। এই সময়েই লকডাউন প্রথা চালু হয়।

সরকারীভাবে বাড়ী বাড়ীতে খাবার পৌছে দেওয়া হতো, মৃতদেহগুলোকে নির্দিষ্ট স্হানে সৎকার করা হতো। তখন পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে এই প্লেগ থেকে পরিত্রানের জন্য লন্ডন শহরে আক্রান্ত এলাকায় আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং এ আগুন চারদিন স্হায়ী ছিল যা ইতিহাসে ‘গ্রেট ফায়ার অফ লন্ডনস’ নামে পরিচিত।

কোয়ারেন্টাইন ব্যাবস্হাও তখন থেকে চালু হয়। বিশেষ করে সংক্রমিত এলাকা থেকে কোন জাহাজ আসলে ভ্যানিস পোর্টে চল্লিশ দিন রেখে দেওয়া হতো। কোয়ারেন্টাইন শব্দটিও ইটালিয়ান শব্দ যার অর্থ চল্লিশ দিন৷ তখনও আধুনিক চিকিৎসা শুরু হয়নি, ইউনানি, হারবাল এসব চিকিৎসার চল ছিল।

মনে করা হতো এসব রোগ দূষিত বায়ুর কারনে ঘটে, তাপ বা স্মোক দ্বারা শুদ্ধ করা যাবে। সেজন্য বাচ্চাদেরকে পর্যন্ত স্মোক করতে উদ্বুদ্ধ করা হতো। ১৭২০-১৭২৩ পর্যন্ত ফ্রান্সের মারসিলিতেও একটি ভয়াবহ প্লেগ হয়েছিল। এ রোগের জীবাণুটিও পণ্যবাহী জাহাজে রডেন্টদের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকেই এসেছিল। ঐ জাহাজকে চল্লিশদিন কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছিল তারপরও ইদুঁর বা রডেন্ট এর মাধ্যমে নগরে ছড়িয়ে পড়েছিল। এক লাখ লোক এতে মারা যায়।

এরপর ১৮৮৫ তে চায়না ও ইন্দোনেশিয়াতে একই ধরনের প্লেগ দেখা যায় এবং বারো মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। এই যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে মহামারীগুলোর কথা এখানে উল্লেখ করা হলো তার সবগুলো কিন্তু ঘটেছিল একটিমাত্র ব্যাকটেরিয়াল জীবানু Yersinia pestis এর মাধ্যমে. তার অর্থ এই নয় যে শুধুমাত্র এই একটি জীবানুই পৃথিবীতে ছিল।

ঐ সময়ে আরো বেশ কিছু আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মহামারি ঘটেছিল বিভিন্ন জীবাণু দ্বারা। শুধুমাত্র একটি জীবাণুর রোগ আক্রমণের ক্ষমতা কতটা তীব্র হতে পারে তা এখান থেকে উপলব্ধি করার জন্য তুলে ধরা হয়েছে। পৃথিবীতে এরকম জীবাণুর সংখ্যা চৌদ্দশতকের উপরে এবং মিউটেশন ও ক্রমাগত হোস্ট পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আরও নতুন নতুন গুণ সম্পন্ন জীবাণুর উদ্ভব হচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে রোগের ধরন।

উনিশ শতক পর্যন্ত স্মলপক্স, কলেরা, টাইফয়েড, যক্ষা, কুষ্ঠ, মিজেলস্ প্রভৃতি রোগগুলো বিভিন্ন সময়ে মহামারী আকারে দেখা দিত এ রোগগুলোকে বলা হয় ক্ল্যাসিক্যাল রোগ। এর মধ্যে ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগগুলো বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে তৈরীকৃত সালফা ড্রাগ, আর্সেনিক ড্রাগ, এন্টিবায়োটিক এগুলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

এর আগ পর্যন্ত পৃথিবীতে এ ধরনের কোন ড্রাগ না থাকায় মহামারীগুলো নিয়ন্ত্রণ করা ছিল অসম্ভব। বাস্তবতা হলো আমরা রোগ নিয়ন্ত্রেনে এন্ট্রিবায়োটিক এত বেশি ব্যবহার করেছি যে

এ প্রভূত্বের মাত্র একশত বছর পার
না করতেই জীবাণুগুলো এন্টিবায়োটিকস রেজিস্ট্যান্স হয়ে তা আবার সিন্দাবাদের ভূতের মতো আমাদেরই ঘাড়ে চেপে বসতে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে আগামি পঁচিশ বছরের মধ্যে যক্ষ্মসহ আরো কিছু রোগ আর প্রচলিত ড্রাগে নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হবে না। অবস্থা হবে ভয়াবহ। প্রশ্ন হলো তাহলে কি আবার ইতিহাসের পূণরাবৃত্তি ঘটবে? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে নিশ্চয়ই নতুন কিছুর উদ্ভব ঘটবে।

আবার গত দুই দশক ধরে মানুষের মধ্যে নতুন কিছু রোগ দেখা যাচ্ছে যা আগে পৃথিবীতে ছিল না যেমন এইডস, ইবোলা, বার্ড ফ্লু, সার্স, মার্স, কভিড-১৯ নানা ধরনের রোগ। শুধুমাত্র ১৯৪০-২০০৪ এ সময়ের মধ্যে গ্লোবালি তিনশত পয়ত্রিশটি সংক্রামক রোগের উদ্ভব ঘটেছে। এশিয়া-প্যাশিফিক অঞ্চল নোভেল ভাইরাস ইমার্জিন এর গ্লোবাল হট স্পটে পরিণত হচ্ছে। অত্র এলাকার মানুষের খাদ্যাভাস, জীবনযাত্রা, এনিম্যাল ফার্মিং প্যাটার্ণ এগুলোর একটা মারাত্মক প্রভাব থাকতে পারে।

ভাইরাস ঘটিত এ রোগগুলো কিন্তু ড্রাগ দিয়ে নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব নয়, প্রয়োজন ভ্যাক্সিন। এই ভ্যাক্সিন দিয়েই উনিশ শতকে গুটি বসন্ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। আবার বিগত একশত বছরে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের বিভিন্ন সাবটাইপ স্প্যানিশ ফ্লু, এশিয়ান ফ্লু, হংকং ফ্লু, বার্ড ফ্লু ও সোয়াইন ফ্লুর মতো পাঁচটি মহামারী সৃষ্টি করেছে, তবুও আজ পর্যন্ত কার্যকরী ভ্যাক্সিন আবিস্কৃত হয়নি। বাজারে যে ফ্লু ভ্যাকসিন পাওয়া যায় তা শুধুমাত্র কিছু সিজিওনাল বা রিজিওনাল ফ্লু ভাইরাসের উপর কাজ করে এবং কার্যকারিতা দুই বছরের বেশী নয়।

এজন্য ভ্যক্সিন থাকা সত্বেও পৃথিবীতে আমরা ইনফ্লুয়েন্জা ভাইরাস ঘটিত ফ্লু দেখতে পাই। এ রোগে তেমন ঔষধও লাগে না শুধু বিশ্রাম, লেবুর শরবত, এমেনটিডিন, প্যারাসিটামল এগুলোতেই ভালো হয়ে যায়। কারন শত বছরব্যাপী বা তারও বেশি সময় ধরে মানুষের দেহে ফ্লু ভাইরাসের বিরুদ্ধে একটি স্ট্রং ইমুউনিটি বা হার্ড ইমুউনিটি তৈরী হয়েছে যা এক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। এজন্য পুরোপৃথিবীর সত্তর থেকে আশিভাগ জনগোষ্ঠীকে সংক্রমিত হতে হয়েছে।

আজকের কোভিড-১৯ আক্রান্ত পৃথিবীর এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে হার্ড ইমুউনিটি তৈরী হতে পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। একটি এলাকা বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হার্ড ইমুউনিটি তৈরী হলেও হবেনা কারন গ্লোবালাইজেশন এর এ সময়ে প্রতিটি রাষ্ট্র এখন আর্থ-সামাজিকভাবে প্রচন্ড রকমের আন্তঃসম্পর্কযুক্ত। ফলে নভেল করোনা ভাইরাসের ট্রান্সমিশন ও রিপিটেড ইনফেকশশনের ঝুঁকিও অনেক বেশি।

মানুষ জম্ম থেকেই জীবানুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে কিছু ভাইরাস এনিম্যাল থেকে মানুষের দেহে জাম্প করছে। মানষের ভাইরাস ঘটিত যে রোগগুলো আছে তার ৮০% এসেছে এনিম্যাল থেকে আর কিছু এসেছে প্রাইমেট বা পূ্র্বপূরুষ থেকে। দেখা গেছে যে একটি ভাইরাস যখন স্পিসিস বেরিয়ার অতিক্রম করে এবং মানুষকে আক্রমণ করে তখন সেটি মারাত্মক হতে পারে।

যেমন বার্ড বা পিগ থেকে ইনফ্লুয়েন্জা ভাইরাস, শিম্পান্জি থেকে এইচআইভি, বন্য প্রানী থেকে ইবোলা, বাঁদুর থেকে সার্স ও কোভিড-১৯ এর ভাইরাস এসেছে। আবার বাঁদুর থেকে ঊট, ঊট থেকে মার্স এর জীবানু এসেছিল। ফার্ম এনিম্যাল ও ডমেস্টিক এনিম্যাল ভাইরাসের সব চেয়ে বড় উৎস। এই এনিম্যালগুলো প্যাথোজেনের অল্টারনেটিভ বা সেকেন্ডারি হোস্ট হিসেবে কাজ করতে পারে।

এদের মাধ্যমেও রিপিটেড মহামারী দেখা দিতে পারে। করোনা ভাইরাসটি পৃথিবীতে নতুন নয়। বর্তমান করোনা ভাইরাসের পূর্বপাদ (ancestor) এর অস্তিত্ব ছিল ৫৫ মিলিয়ন বছর আগে যা বাদুর ও পাখির সাথে সহ-অভিব্যাক্তির মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়েছে। করোনা ভাইরাসটি প্রথম সনাক্ত হয়েছিল ১৯৩৭ সালে চিকেন এর দেহে। পরে মানষের দেহে সনাক্ত হয় ১৯৬০ এর দশকে। প্রথম দিকে মানুষের দেহে রোগ সৃষ্টিকারী করোনা ভাইরাস খুব বেশি ভিরুলেন্ট ছিল না।

এপর্যন্ত মানুষকে আক্রমণকারী সাতটি করোনা ভাইরাস আবিস্কৃত হয়েছে। এর মধ্য চারটি সাধারন কোল্ড এর মতো মৃদু সংক্রমণ এবং বাকি তিনটি SARS CoV, MERS CoV ও SARS CoV2 তীব্র সংক্রমণ ঘটাতে পারে। ২০০২ সালে SARS CoV ভাইরাস সার্স ও ২০১৫ সালে MERS CoV ভাইরাস মার্স মহামারী ও নভেল করোনা ভাইরাস (SAR CoV 2) এ সময়ের বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ সৃষ্টি করেছে।

দেখা গেছে করনা ভাইরাসের চারটি গনের মধ্যে আলফা ও বিটা স্তন্যপায়ী প্রানি যেমন মানুষ সহ বাদুর, উট,গবাদি পশু, বিড়াল, ইদুঁর এর দেহে এবং গামা ও ডেল্টা পাখি ও মাছের দেহে থাকে। মানুষ যদি দীর্ঘদিন এই প্রাণীগুলোর ক্লোজ কনটাক্টে থাকে তখন সহজেই ভাইরাসটি পরিবর্তিত হতে পারে এবং মানুষের দেহে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। আর মিউটেন্টটি যেহেতু একটি নভেল ভাইরাস তাই এর বিরুদ্ধে মানুষের পূর্ব থেকে ইমুউনিটি থাকে না।

আবার যদি এই ভাইরাস ভিরুলেন্ট হয় এবং মানুষের দেহে স্টাবলিশ করতে পারে তাহলে সর্বোচ্চ সংক্রমণ বা মাস পপুলেশনের মধ্যে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। ক্রমাগত সংক্রমণ ঘটিয়ে মহামারী সৃষ্টি করতে পারে। আবার একইভাবে অনেকগুলো লাইফ সাইকেল অতিক্রম করে নিজেরা ও দূর্বল হতে পারে।

কিন্তু সমস্যা হলো একাধিক হোস্ট থাকা যা থেকে আরো নতুন নতুন সাবটাইপ তৈরী হতে পারে। যেমনটি আমরা ইনফ্লুয়েন্জাতে দেখতে পাই। ভাইরাসটি পিগ ও পাখি থেকে মানুষে জাম্প করেছে এবং বার বার মহামারী সৃষ্টি করছে। করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবণাটি প্রকট। হতে পারে আট দশ বছর পরপর একটি নভেল করোনা সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারী যা একবিংশ শতাব্দী জুড়েই চলতে পারে। এ সম্ভাবণাকে কোনভাবেই নাকচ করা যাবেনা।

COVID-19 সৃষ্টিকারী নভেল করোনা (SARS CoV2) ভাইরাসটি একটি একক স্ট্রান্ড আরএনএ যুক্ত এনভেলপড ভাইরাস। এর ৩০০০০টি নাইট্রোজেন বেস ও ২৮ ধরনের প্রোটিন আছে। শুধু স্পাইক প্রোটিনে আছে ১২৭৪ টি আ্যামাইনো এসিড। এনভেলপের বাইরের দিকে স্পাইকগুলো বিন্যস্ত থাকে। তিনটি করে স্পাইক একসাথে থেকে ক্রাউনের মতো স্ট্রাকচার তৈরী করে সেজন্য নামকরন হয়েছে করোনা।

ইনফ্লুয়েন্জা, এইচআইভি, করোনা এগুলো স্পাইক যুক্ত এনভেলপড ভাইরাস। এদের আর্কিস্ট্রাকচারাল ডিজাইন যতটাই সুন্দর এরা ততটাই ডেন্জারাস। এই স্পাইকগুলো হলো এন্টিজেন। এদের রাসায়নিক গঠন উপাদানের সামান্য পরিবর্তনে একটা নতুন মিউটেন্ট বা সেরোটাইপ তৈরী হতে পারে। যতবেশি সরোটাইপ তৈরী হবে ভ্যাকসিন এর জন্য তত প্রতিবন্ধকতা তৈরী হবে।

করোনা ভাইরাসটিও ইতিমধ্যে অনেকবার পরিবর্তিত হয়েছে। সারা পৃথিবীতে ৬৮,৬৮৮ টি করোনা স্ট্রেন এর জিনোম সিকুয়েন্স করা হয়েছে। এর মধ্যে ডি৬১৪জি মিউটেন্টটি বাংলাদেশে বেশি সক্রিয়। ইতিমধ্যে স্ট্রেনটির জিনোমিক পর্যায়ে ৫৯০টি ও আ্যামাইনো এসিড পর্যায়ে ২৭৩টি পরিবর্তন ঘটেছে।

বাংলাদেশে সক্রিয় স্ট্রেনটির স্পাইক প্রোটিনে ৩৬টি আ্যামাইনো এসিড পরিবর্তিত হয়য়েছে। যেসকল দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমনের হার বেশি ছিল সেখানে ভাইরাসটির জিনে ৩৪৬-৫১২ নম্বর ধারা মারাত্মকভাবে সক্রিয় ছিল। বাংলাদেশে এইধরনের মিউটেন্ট দেখা যায় নাই। এদিক দিয়ে আমরা ভাগ্যবান। আবার ভারতের এক রিপোর্টে দেখা গেছে যে ২৩-২৫% মানুষের মধ্যে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে এন্টিবডি ডেভেলপ করেছে এবং সম পরিমান এফেক্টেটেট হয়েছে। আর্থাৎ আমরা হার্ড ইমুউনিটির দিকে এগুচ্ছি। হয়তো আমরা খুব নিকট ভবিষ্যতে এ সংকট কাটিয়ে উঠবো কিন্তু অনাগত ভবিষ্যত শংকা মুক্ত হবে না।

ভাইরাস ঘটিত রোগের একমাত্র প্রতিরোধক ভ্যাকসিন । কিন্তু‘ সকল রোগের ভ্যাক্সিন তৈরী করা সম্ভব হয়নি বা হলেও তার কার্যকারিতা সমান নয়। এর কারন হলো জীবানুগুলোর এন্টিজেনিক ভিন্নতা বা একাধিক সেরোটাইপ থাকা বা একই প্যাথোজেনের একাধিক পোষক থাকা ইত্যাদি। আর ঠিক একারনে এইডস বা ইনফ্লুয়েঞ্জার কার্যকরী বা দীর্ঘ মেয়াদী ভ্যাকসিন তৈরী হয়নি। সাধারনত যে সমস্ত ভাইরাসের মিউটেশনের ফ্রিকুয়েন্সি বেশি তার এন্টেজিনিক বৈশিষট্যগুলোও দ্রুত পরিবর্তন হয়।

এই পরিবর্তনটার জন্য ভাইরাসটি অধিকতর সংক্রমণশিল হতে পারে বা রোগ আক্রমণের ক্ষমতা হারাতে পারে। বিভিন্ন প্যাথোজেনের এন্টেজেনিক প্রোপার্টিজ বিভিন্ন রকমের যেমন ভাইরাসের ক্ষেত্রে ক্যাপসিড, এনভেলপ বা স্পাইক আবার ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে টক্সিন, ক্যাপ্সুল বা কোষ প্রাচীর। প্রতিটি এন্টিজেনের আবার সুনির্দিষ্ট বাইন্ডিংসাইট আছে যাকে এপিটপস্ বলে যা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পোষক দেহে অবস্থিত একটি কম্পলিমেরি রিসেপ্টরের সাথেই যুক্ত হতে পারে।

এ দুটো ম্যাচ না করলে প্যাথোজেন কখনই পোষকদেহে স্টাবলিশ করতে পারেনা বা রোগ সৃষ্টি করতে পারেনা। কিন্তু COVID-19 সৃষ্টিকারী নোভেল করোনা ভাইরাসের বাইন্ডিংসাইট স্পাইক প্রোটিনে দুটি সাব ইউনিট S1ও S2 থাকে। S1 এর দুটি রিজিওন S1-NTD ও S1-CTD আছে যা পোষক কোষের এক বা একাধিক রিসিপ্টরসাইট যেমন ACE2, APN, DPP4 এর সাথে যুক্ত হতে পারে।

এগুলো সাধারনত মানুষের শ্বাসযন্ত্র, অন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গের কোষে থাকে। ফলে COVID-19 এ আক্রান্ত রোগির শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা ছাড়াও ডায়রিয়া, স্বাদহীনতা, গন্ধহীনতা, কিডনিফেইলিওরসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয় অর্থাৎ মাল্টিঅর্গান ডিজঅর্ডার দেখা দেয়। যেহেতু এখনও ভ্যাকসিন আবিস্কার হয় নাই তাই সাপোর্টিভ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। দেখা গেছে এন্টিম্যালেরিয়াল ও এন্টিভাইরাল ড্রাগ করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে বেশ কার্যকর। মহামারীর শুরুর দিকে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় chloroquine ও azithromycine দেওয়া হতো। পরে ডেঙ্গু চিকিৎসার এন্টিভাইরাল ড্রাগ ivarmectin ব্যবহার করা হয়। ইবোলা, সার্স ও মার্স ভাইরাসে ব্যবহৃত এন্টিভাইরাল ড্রাগ remdesivir ও বেশ কার্যকর।

আবার এইডসে ব্যবহৃত lopinavir ও ritonavir এককভাবে খুব একটা কার্যকর নয় কিনতু ফ্লু ড্রাগ oseltamivir এর সাথে কম্বাইন্ডলি বেশ কার্যকর। সেকেন্ডারী ইনফেকশন রোধে অ্যাজিথ্রোমাইসিন অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে। আবার প্রয়োজনবোধে এন্টিব্লাডক্লটিং ড্রাগ, ভেন্টিলেশন, প্লাজমা থেরাপী, এন্টিবডি থেরাপী দ্বারা নানাভাবে ঈঙঠওউ-১৯ মোকাবেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন এর হিউম্যান ট্রায়াল চলছে। বিশ্ববাশী তাকিয়ে আছে একটি কার্যকরী ভ্যাকসিনের আশায়। কিন্তু রোগ প্রতিকার এর সাথে প্রতিরোধ ব্যবস্হাও জোরদার থাকতে হবে। সেজন্য প্রচলিত ব্যবস্হা সাবান পানিতে হাত ধোয়া, মাস্ক পরিধান করা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, পাবলিক প্লেস বা জনসমাগম এড়িয়ে চলা, স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, সংক্রমণ হলে অইসোলেশনে থাকা এগুলো মানতে হবে। কোভিড-১৯ প্রতিরোধে ব্যবহৃত বর্জ্য যেমন মাস্ক, পিপিই, গ্লভস এগুলোকে ঠিকমতো ডিজপজ করতে হবে না হলে এগুলোও হতে পার সংক্রমন এর উৎস।

করোনা ভাইরাস জীবানুটি যেহেতু খুব ছোট (১২৫nm) তাই আক্রান্ত ব্যাক্তির হাচি, কাশি, কথাবলার সময় জলবিন্দুর (water droplets ) সাথে বেরিয়ে আসে ও বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে। রুমের ডাস্ট পার্টিক্যালকে সাপোর্ট করে দীর্ঘ সময় বাতাসে টিকে থাকতে পারে এবং এক সময় ফ্লোরে জমা হবে। আবার ঘর ঝাড়ু বা বিভিন্ন মুভমেন্ট এর সময় রুমে আবার সার্কুলেট হবে।

এজন্য ফ্লোর ক্লিনিং এর সময় অবশ্যই ডিজইনফেকটেন্ট ব্যবহার করতে হব। রুমের দরজা জানালা খুলতে হবে এবং সূর্যের আলো আসতে দিতে হবে। এতে করে রুম অভ্যন্তরে ভাইরাল লোড কম হবে এবং সূর্যের আলোর সাথে যে uv-ray আসবে তাতে কিছু ভাইরাস মারা যাবে। রুমে এয়ার পিউরিফায়ার লাগানো যেতে পারে, ডিসইনফেক্ট্যান্ট স্প্রে করা যেতে পারে। আবার সনাতনি পদ্ধতিতে স্মোক বা আগরবাতিও ব্যবহার করতে পারি। এগুলো ভালো এয়ার পিউরিফায়ার। নিজগৃহকে জীবাণু মুক্ত রাখতে হবে। এ্যাপার্টমেন্ট এর লিফট, সুপার মল, যেকোন এসি মার্কেট, এসিবাস, বিমান এ সমস্ত জায়গায় তাপমাত্রা অনুকূল থাকায় ভাইরাস অধিক সময় টিকে থাকতে পারে। তাই এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ।

মনে রাখতে হবে কেবল সমন্বিত প্রচেষ্টায় এ দূ্র্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব। জীবানুরা হেরে গেলে মানুষ জিতে যায় আর মানুষ জিতে গেলে জীবানুরা হেরে যায়। জীবানুরা যেমন অনেক মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করেছে তেমনি মানুষও জীবাণুকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রতিটি মহামারী আমাদের শিখিয়েছে অনেক কিছু।

স্যানিটেশন ব্যাবস্থা, জীবানুনাশক, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, এন্টিবায়োটিক, ভ্যাকসিন ইত্যাদি ব্যাবহার করতে শিখেছি। কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারীর কারনেও আমাদের চিরচেনা পৃথিবী ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। মানুষের জীবন, জীবিকা ও আর্থ- সামাজিক অবস্হা পাল্টে যাচ্ছে্। আমাদের জীবনাচাণরও অনেক পরিবর্তন ঘটবে।

ইনফ্লুয়েন্জার মতো কোভিড-১৯ ও একটি পরিচিত ও সিজিওনাল অসুখ হিসেবেই বিরাজ করবে পৃথিবীতে। তবে ভয় পেলে চলবে না। এখন আমাদের টিকে থাকাটাই আসল কথা- আর তার জন্য সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক।

লেখক: অধ্যাপক, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *