মোঃ মেজবাহুল ইসলাম
১৯৭৫ সালের ৩০শে জুলাই ছোটবোন শেখ রেহেনা, পুত্র জয়, কন্যা পুতুলকে নিয়ে জার্মানিতে স্বামী ড.এম.ওয়াজেদ মিয়ার কাছে যান বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গকন্যা শেখ হাসিনা। কথা ছিল শেখ রেহেনা বোনের সাথে কিছুদিন থেকে দেশে ফিরে আসবেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সহ তাঁর পুরো পরিবারকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। ১৫ই অগাস্ট, ১৯৭৫ – শেখ হাসিনা, তাঁর স্বামী ডক্টর ওয়াজেদ মিয়া আর বোন শেখ রেহানা সেদিন ব্রাসেলস-এ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের কাছে ছিলেন।
ব্রাসেলস থেকে ওঁদের প্যারিস যাওয়ার কথা। কিন্তু আগের দিন গাড়ির দরজায় ডক্টর ওয়াজেদের হাত চিপে গিয়েছিল।ওঁরা আলোচনা করছিলেন ওই অবস্থায় প্যারিস যাবেন কী-না।
১৫ই আগস্ট সকালে জার্মানির তৎকালীন রাষ্ট্রদূত হুমায়ন রশীদ চৌধুরী ব্রাসেলসের রাষ্ট্রদূত সানাউল হককে ফোন দিয়ে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর ক্যু সম্পর্কে জানান এবং তাকে শেখ হাসিনা, শেখ রেহেনা ও ওয়াজেদ মিয়াকে প্যারিসের বদলে জার্মানির বনে পাঠাতে বলেন।যে মুহূর্তে সানাউল হক শুনলেন যে সেনা বিদ্রোহে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছেন, তখনই তাঁর দুই কন্যা এবং জামাতাকে কোনও রকম সাহায্য করতে অস্বীকার করলেন। উপরন্তু নিজের ঘর থেকেও তাঁদের চলে যেতে বলেন।
তবে তাঁরা কোনও মতে জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশিদ চৌধুরীর কাছে পৌঁছেছিলেন।তখনও বঙ্গবন্ধু কন্যাদ্বয় বাংলাদেশ ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়।হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী উপায়ন্তর না দেখে বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে একজন সাধারণ রাষ্ট্রদূত হিসেবে ১৯শে আগস্ট তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে কূটনীতিক প্রটোকল ভেঙে ফোন দিয়ে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারকে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে রাজী হয়ে গিয়েছিলেন মিসেস গান্ধী। “২৪শে অগাস্ট এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমানে শেখ হাসিনা তাঁর পরিবারের বাকিরা দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে নেমেছিলেন।সেখান থেকে তাদের অতি গোপনে একটি “সেফ হাউসে” নেয়া হয়।সেসময় ভারতে জরুরি অবস্থা চলছিল বলে তৎকালীন ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের হত্যাকান্ড সম্পর্কে তেমন খবর ছিলনা বলেই শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবার পুরো ঘটনা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতেননা।
৪ঠা সেপ্টেম্বর মিসেস গান্ধী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করেন এবং সেখানে উপস্থিত একজন অফিসার শেখ হাসিনাকে জানান তাঁর পরিবারের আর কেউ বেঁচে নেই।এটা শুনেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন শেখ হাসিনা।
ইন্দিরা গান্ধী হাসিনাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তোমার যা ক্ষতি হয়েছে, তা তো পূরণ করা যাবে না। তোমার তো এক ছেলে, এক মেয়ে আছে। আজ থেকে ছেলেকে নিজের বাবা আর মেয়েকে নিজের মা বলে মনে কোরো।”শেখ রেহানার সে বছরই দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনাবলীর জন্য তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে শান্তিনিকেতনে তাঁর ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে নিরাপত্তা-জনিত কারণে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছিল।
২৪শে জুলাই, ১৯৭৬ – শেখ রেহানার বিয়ে হয় লন্ডন-প্রবাসী শফিক সিদ্দিকের সঙ্গে। কিন্তু শেখ হাসিনা এবং তাঁর স্বামী ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি। ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রীত্ব হারালে শেখ হাসিনার নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।এরমধ্যেই বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারেন।১৯৮০ সালে মিসেস গান্ধী পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হলে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় কেটে যায়।
এর মাঝেই আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেত্রী বৃন্দ শেখ হাসিনার সাথে দেখা করে তাঁকে দেশে ফিরে এসে দলের হাল ধরার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন।কিন্তু স্বামী ওয়াজেদ মিয়া দেশের এই গোলযোগপূর্ণ অবস্থায় শেখ হাসিনার দেশে ফিরা ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন।এরমধ্যেই ৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারী ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে না জানিয়েই আস্থা ও ঐকের প্রতীক হিসেবে সভানেত্রী নির্বাচিত করেন।
১৯৮১ সালের ১৭ই মে ৩ই জৈষ্ঠ্য ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ শেখ হাসিনা ঘাতকের চেনা মুখ ও শ্বাপদের বুলেটের আঘাতের সমূহ আশংকা নিয়ে চোখের জলে ভেজা পথ পাড়ি দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন নিয়ে মেয়ে পুতুল, আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ আর কোরবান আলীর সঙ্গে ঢাকা পৌঁছান। ৭৫ এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পুরো-পরিবারকে হত্যার ফলে বাংলার আকাশে যে কালো মেঘের সৃষ্টি হয়েছিল ও হত্যার দীর্ঘ ৬ বছর যে বিভীষিকাময় দিন কাটিয়েছিল বাংলার জনগণ তাঁরই সারমর্ম ছিল ৮১ এর ১৭ই মে এর প্রকৃতিতে।বঙ্গবন্ধু কন্যার আগমনে শুরু হয়ে গিয়েছিল স্বস্তির বৃষ্টি।
বঙ্গবন্ধুর কন্যার আগমনে বাংলাদেশ পুনঃ জন্মর ভিত্তি রচিত হয়েছিল। ৩৯ বছর আগের এই দিনে জননেত্রী শেখ হাসিনা ছয় বছর প্রবাস জীবন থেকে দেশে প্রত্যাবর্তন করার পর তাঁকে এক নজর দেখার জন্য কিশোর, তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ নির্বিশেষে অগণিত মানুষ বাস, ট্রাক, লঞ্চ, স্টীমার ও ট্রেনযোগে দেশের দূরদূরান্ত থেকে ঢাকা এসে সমবেত হয়।
এদিকে সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে অধিকারবঞ্চিত মুক্তিপাগল তথা গণতন্ত্রকামী লাখো জনতার কণ্ঠে গগনবিদারী শ্লোগান ওঠে, ‘ জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘বঙ্গবন্ধুর রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘আদর্শের মৃত্যু নেই, হত্যাকারীর রেহাই নেই, শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’। কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শেরেবাংলানগর পর্যন্ত জনসমুদ্র। রাজধানীর সব পথ মিশে গিয়েছিল বিমানবন্দরে।
সবার লক্ষ্য ছিল বিমানবন্দর। শাসক মহলের কাছে তো ছিল কল্পনার অতীত। শাসক মহল ধারণা করতে পারেনি যে এভাবে মানুষ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে ছুটে আসবে। সত্যিকার অর্থে দেশবাসী তো চাইছিল অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি।
সমবেত প্রায় ১৫ লক্ষ জনতার সামনে কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন-পিতা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে তিনি বাংলার মাটিতে ফিরে এসেছেন। সব হারিয়ে নতুন করে হারাবার তাঁর আর কিছু নেই। এছাড়া তিনি আরও বলেন-আমি সাধারণ মেয়ে,নেতা নই।বঙ্গবন্ধুর আর্দশ প্রতিষ্ঠার সাধারণ একজন কর্মী।
বঙ্গবন্ধু যেমন টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া আওয়ামী লীগ গঠনের জন্য গ্রামে গ্রামে গিয়েছিলেন ঠিক তেমনিভাবে যোগ্য পিতার যোগ্য কন্যা হিসেবে তিনিও আওয়ামী লীগ পুনঃগঠনের উদ্দেশ্যে সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। বার বার হত্যার উদ্দেশ্য হামলা হলেও তাঁর মনোবল থেকে তাঁকে একচুলও নড়াতে পারেনি কেউ।
তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। তিনি শুধু এখন দেশের সম্পদ নয়, সারা বিশ্বের সম্পদ।
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু
লেখকঃ সহ-সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।