রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ০৮:৩১ অপরাহ্ন

বুয়েটের ছাত্র হত্যা প্রসঙ্গে: শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা

  • আপডেট টাইম শনিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৯, ৫.৫৯ পিএম

আরিফুজ্জামান রাজীবঃ বুয়েটের একজন ছাত্রকে গত ৬ তারিখ রাতে হত্যা করা হলো।এ ঘটনা সারা বাংলার মানুষকে নাড়িয়ে দিয়ে গেলো। আমরা যারা প্রবাসে আছি দেশ থেকে দূরে থাকলেও দেশের এরূপ মর্মান্তিক ঘটনা অামার মতো আরও অনেকেরই রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলো। কি বিভৎস ঐ ঘটনা! কি মর্মান্তিক!

হলের ২০১১ কক্ষে রাত আনুমানিক ৮:৩০ থেকে ৩টা পর্যন্ত চললো অমানুষিক নির্যাতন। কেউ এগিয়ে এলো না? কেউ তাকালোও না? মরার পরেও কেউ ঘুরে দাঁড়ালো না? খুনিরা হল প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করলেন, কীভাবে আলামত নষ্ট করা যায়? কীভাবে এই ঘটনাটাকে অন্যদিকে নেয়া যায়?

এই পুরো ঘটনার জন্য কে বা কি দায়ী হতে পারে? আমাদের শিক্ষকদের এখানে দায় কতটুকু?

আমার ৩.৫ বছর শিক্ষকতা আর ৬ বছরের পড়াশুনার জীবনে একটা জিনিস খেয়াল করেছি, ছাত্র-ছাত্রীদের এই অন্যায় করা, অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকা, নিজের স্বার্থের দিকে আগে নজর দেয়া, এগুলোর জন্য মূল দায়ী শিক্ষক সমাজ আর কিছুক্ষেত্রে পরিবার। ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক বিকাশের পেছনেও মূল অন্তরায় শিক্ষকদের মানসিক সমস্যা, সাথে পরিবারিক অসঙ্গতি।

আবরারের ঘটনা সবাইকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, শিক্ষক ছাত্রের মধ্যে সম্পর্কটা আসলে স্বার্থের, ভীষণ দুর্বল ও মেকি। একটি ছাত্রকে হলে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হলো অথচ হল প্রভোস্ট জানেনই না তার হলে কী হচ্ছে বা জেনেও মাথা ঘামায় না। এ দায় কার??

শুধু শিক্ষকরা বললে কিছুটা ভুল হবে মোটামুটি আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় ছাত্র-ছাত্রীদেরকে একটা প্যারামিটারে আমরা মেপে থাকি, তা হলো রেজাল্ট ভিত্তিক পড়াশুনায় ভালো ছাত্র-ছাত্রী আর খারাপ ছাত্র-ছাত্রী। যার সিজিপিএ বেশি সে ভালো ছাত্র আর যার সিজিপিএ কম সে খারাপ ছাত্র বা ছাত্রী। এই শ্রেণী বিন্যাসের পর, শুরু হয় আসল খেলা।

এই সিজিপিএ বেশি পাওয়া ছাত্র বা ছাত্রীটিকে মানসিকভাবে বিকালঙ্গ, স্বার্থপর, লেজুড়বৃত্তিক মানুষ বানানোর জন্য উঠেপড়ে লাগে। সে যেন বই ছাড়া অন্য কিছু না বুঝে, তাকে অমুক হতে হবে, তমুক করতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। একটা উদাহরণ দিয়ে বললে বুঝতে সুবিধা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ বা অন্য কোন সামাজিক অসংগতি নিয়ে যদি কোন ছাত্র আন্দোলন হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝের সারির ছাত্র-ছাত্রীরা সামনে চলে আসে, শেষের সারির গুলো ব্যবহার হয় রাজনৈতিক দল বা বড় ভাই দ্বারা, আর ক্লাসের প্রথম সারির ছাত্র-ছাত্রীরা হয় মাথা লুকিয়ে রাখে, নয়তো কোনো অংশগ্রহনই থাকে না। আর যদি ভুল করে সামনের সারির কোন ছাত্র বা ছাত্রী সামনে চলে আসে, তখন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক তাকে একা একা ডাকে। তাকে বুঝানো হয়, এই আন্দোলন তোমার জন্য না, তুমি পড়বে, তুমি আমাদের সম্পদ, তোমাকে সেটা অনুধাবন করতে হবে, ব্লা ব্লা ব্লা।

এসব বলে ছেলেটার/মেয়েটার যে কি উপকার হলো, আমি জানি না। কিন্তু ছেলেটার/মেয়েটার সমাজের, আমাদের যে কি ক্ষতি হলো তা আমি বুঝতে পারি। ঐ ছেলেটা মানসিকভাবে শেষ, স্বাভাবিক ভালো মন্দ বুঝার জ্ঞান সে হারিয়ে ফেলে। গুরুর সাথে তার একটা স্বার্থের সম্পর্ক তৈরি হয়। তার মাথায় ঢুকে গেল, যদি এসব কাজে না যাই, ঐ শিক্ষক আমার জন্য সুপারিশ করবে চাকরি বা অন্য কোথাও। সে আবার শিক্ষক হলে আবারো এমন বহু ছাত্রকে মানসিক বিকালঙ্গ করে ফেলবে। এভাবে পুরো সমাজে অাজ তিন ভাগে বিভাজিত হয়ে গিয়েছে । এক তথাকথিত খারাপ ছাত্র, অল্প সংখ্যক মানুষ যারা এধরনের শিক্ষক বা পরিবারের বলয় থেকে বের হতে পারছে, আর ঐ শ্রেণীর যারা বিকালঙ্গ বানাচ্ছে সেটা শিক্ষক ও পরিবারের সদস্য দুইই হতে পারে।

এবার আমরা আবরারের ঘটনার দিকে চোখ ফেরাই। হলের ঐ ঘটনা নতুন না, সবাই জানতো কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করেনি। শিক্ষকদের বলা হলে তারা বলতো, এ নিয়ে তোমরা কেন চিন্তা করছো, তোমরা ভালো ছাত্র, বুয়েটে পড়ো। কিছু ছাত্র নষ্ট হয়ে গেছে, ওদের নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করো না। বরং আরো দুইটা নতুন প্রোজেক্ট বা কাজ করো, দেখবে এগুলো আর মনে থাকবে না।

এভাবে দিনে দিনে পুরো হলের ছাত্রদের মানসিক বিকালঙ্গ করা হয়েছে। আর ঐ অল্পকয়জন গুণধর দেখেছে, তাদের পেছনে বিশাল সাপোর্ট আছে। এই মানসিক অবসাদের যেই বেড়া তা অল্প কিছু ছাত্র-ছাত্রী ভাংতে পারে। সংখ্যায় কম বিধায় তারা সপ্তাহে ১-২ জনকে এভাবে পিটাতে দেখেও তাদের বলার সুযোগ ছিল না, আর যাদের কিছুটা বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো তারা নানাবিধ কারণে জেগে ওঠার আগেই স্তমিত হয়ে যেত।

তাই অামার মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে এই আপদ দূর করার উপায় হলো মেধাবীদের রাজনীতি সচেতন করে তুলতে হবে। ভালো মন্দ বুঝার মত মনন সৃষ্টি করতে হবে। পুস্তকের জ্ঞানের পাশাপাশি মননের জ্ঞান আহরণ করতে হবে। যখন একজন মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রী নেতৃত্বে আসবে, তখন ঐ না জানা ইতর রাজনৈতিক দর্শন জানালা দিয়ে পালাবে।

শিক্ষকদের আরও অনেক বেশি সহনশীল হতে হবে, কোন ছাত্র-ছাত্রী আন্দোলনে গেলেই সে বখে যায় না, এটা অনুধাবন করতে হবে। আমার মতাবলম্বি বলেই তার জন্য সুপারিশ করতে হবে, আর না হলেই তার পদেপদে কন্টক দিয়ে রাস্তা বন্ধ করতে হবে, এই চিন্তা ধারা থেকে বের হয়ে অাসতে হবে। শিক্ষকদের এটা অনুধাবন করতে হবে, শুধু পুস্তকের শিক্ষাই আসল শিক্ষা না, মননশীলতার, মানবিক শিক্ষাই আসল শিক্ষা। ভালো কাজে সাহস দিতে হবে, উৎসাহিত করতে হবে, সেটা কঠিন পথ হলে কাঁধে কাঁধ রাখতে হবে।

শিক্ষকদের পাশাপাশি পরিবার, সমাজকেও একই ধারণা ধারণ করতে হবে। ভালো কাজে পাশে থাকতে হবে, মানসিক বিকাশের জন্য, মননের বিকাশের জন্য। তাদেরকে বুঝাতে হবে, নিজের জন্য না অন্যের জন্য বাঁচো। যেই বাঁচায় আনন্দ আছে, অন্যের ভালোবাসা আছে।



লিখেছেনঃ সহকারী অধ্যাপক (শিক্ষাছুটি), ইটিই বিভাগ,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।



The Campus Today YouTube Channel

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
themesbazar_creativenews_II7
All rights reserved © 2019-20 The Campus Today