লবণে লুকিয়ে আছে যেসব গুণ

আসিফ আহমেদ মাহাদী


‘লবণ’ যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য উপাদান। মানব সভ্যতার খাদ্যভ্যাসে লবণহীন খাবার যেন সবকিছু পানসে করে দেয়। কিন্তু এই নুনের (লবণ) ও যেন অনেক গুণ, রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যবহার ও ব্যাখ্যা।

লবণ দেহ গঠন ও দেহের অভ্যন্তরীণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, অস্থি, দাঁত, এনজাইম ও হরমোন গঠনের জন্য খনিজ লবণ অপরিহার্য উপাদান, স্নায়ু উদ্দীপনা ও পেশি সংকোচন নিয়ন্ত্রণ করে, দেহের জলীয় অংশে সমতা রক্ষা করে ও বিভিন্ন এনজাইম সক্রিয় রাখে। ক্যালসিয়াম দাঁত ও হাড় গঠনে সহায়তা করে।

তেমনি মানবদেহের খাদ্যভ্যাসের জন্যে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) সুপারিশ করে যে প্রাপ্তবয়স্করা প্রতিদিন 5 গ্রাম (কেবলমাত্র এক চা চামচের নীচে) লবণ গ্রহণ না করে। উচ্চ সোডিয়াম গ্রহণ (5 গ্রাম লবণ / দিন) এবং অপর্যাপ্ত পটাসিয়াম গ্রহণ (৩.৫ গ্রাম / দিনেরও কম) উচ্চ রক্তচাপের সাথে যুক্ত হয়েছে এবং হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

রসায়নে লবণ, একটি ক্ষারের সাথে অম্লকের প্রতিক্রিয়া দ্বারা উৎপাদিত পদার্থ যার একটি সোডিয়াম (Na) ও অন্যটি ক্লোরিন (Cl) এর প্রতিক্রিয়ায় উৎপাদিত “সোডিয়াম ক্লোরাইড” (NaCl) বা “লবণ”। লবণ মূলত সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) দ্বারা গঠিত একটি খনিজ।

বিশ্বে উৎপাদিত লবণের প্রায় ৬% খাবারেই ব্যবহৃত হয়। বাকীগুলির মধ্যে, ১২% পানি পরিশোধন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়, ৮% ডি-আইসিং হাইওয়ের জন্য যায় এবং ৬% কৃষিতে ব্যবহৃত হয়। বাকী ৬৮% উৎপাদন এবং অন্যান্য শিল্প প্রক্রিয়াগুলির জন্য ব্যবহৃত হয়। লবণ বা সোডিয়াম ক্লোরাইড হ’ল ভলিউম দ্বারা ব্যবহৃত বৃহত্তম অজৈব কাঁচামালগুলির মধ্যে একটি।

ক্লোর-ক্ষার শিল্প যেখানে রাসায়নিক ভাষ্যমতে লবণ বা সোডিয়াম ক্লোরাইড পানির সাথে বিক্রিয়া করে ক্লোরিন, হাইড্রোজেন ও সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড ( NaOH) তৈরি করে। যেখানে ক্লোরিনের(Cl) কিছু প্রয়োগের মধ্যে রয়েছে পিভিসি, জীবাণুনাশক এবং দ্রাবক। সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড(NaOH) এমন শিল্পগুলিকে সক্ষম করে যা কাগজ, সাবান এবং অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন করে।

সোডা এ্যাশ শিল্পে লবণ বা সোডিয়াম ক্লোরাইডকে সোলেয়াম প্রক্রিয়ায় সোডিয়াম কার্বনেট এবং ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড উৎপাদন করতে ব্যবহৃত হয়। পরিবর্তে সোডিয়াম কার্বোনেট গ্লাস, সোডিয়াম বাইকার্বোনেট এবং রঞ্জক, পাশাপাশি অন্যান্য রাসায়নিকের অগণিত উৎপাদন করতে ব্যবহৃত হয়।

টেক্সটাইল এবং রঞ্জনকরণে, জৈব দূষকগুলিকে পৃথক করতে, ডাইস্টাফ প্রাকৃতিকল্পের “সল্টিং আউট” প্রচার করতে এবং সেগুলির মানককরণের জন্য সংমিশ্রিত বর্ণের সাথে মিশ্রিত করার জন্য লবণকে ব্রাইন কলা হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

মাটি সুরক্ষিত করার জন্য এবং যে ভিত্তিতে মহাসড়কগুলি নির্মিত হয়েছে তার দৃড়তা প্রদানের জন্য লবণও যুক্ত করা হয়। লবণটি আর্দ্রতা এবং ট্র্যাফিক লোডের পরিবর্তনের মাধ্যমে উপচেপণে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রভাবগুলি হ্রাস করতে সহায়তা করে।

লবণের দ্বিতীয় প্রধান প্রয়োগ হ’ল গ্রিট বিন এবং শীতকালীন পরিষেবা যানবাহনের দ্বারা ছড়িয়ে দেওয়া উভয় রাস্তার ডি-আইসিং এবং অ্যান্টি-আইসিংয়ের জন্য, যা শীতপ্রধান দেশে বেশী দেখা যায়।

সুতরাং লবণের ব্যবহার যে সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। উৎপাদিত লবণের সাথে আয়োডিন সহ বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে যেমন আমরা খাবারে ব্যনহার করি তেমনি ঐ লবণ বা সোডিয়াম ক্লোরাইড এর সাথে অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে বিভিন্ন রাসায়নিক ইন্ডাস্ট্রি, টেক্সটাইল ও ডাইং শিল্পে রয়েছে এর উল্লেখযোগ্য ব্যবহার।

তাই আমাদের লবণ চাষে চাষীদের বেশীবেশী আগ্রহী করে তুলতে হবে। লবণ চাষীদের লবণের সকল ক্ষেত্রে ব্যবহার সম্পর্কে জানাতে হবে, বৈজ্ঞানিক ব্যবহার সম্পর্কে জানাতে হবে যেন তারা লবণ চাষে উদ্ভবুদ্ধ হয়। প্রাচীন সনাতন পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনের প্রক্রিয়া ছাড়া নতুন ও আধুনিক পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন সম্পর্কে জানাতে হবে।

দেশে একটি লবণ নীতি থাকাতে হবে যার ফলে সরকার ও সেখান থেকে রাজস্ব পায়। লবণ উৎপাদনের এ সাফল্য আনয়নে বাংলাদেশের যে প্রতিষ্ঠানটি লবণ চাষীদেরকে বিভিন্ন প্রকার সম্প্রসারণমূলক সেবা প্রদান করে আসছে সেটি হলো বিসিক। লবণ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিসিকের সেবা সহায়তা, নতুন প্রযুক্তি ও পরামর্শমূলক কর্মকান্ডের আরও ব্যাপ্তির ঘটাতে হবে।

শুধু খাবার হিসেবেই নয়, উৎপাদিত লবণের এক বিরাট অংশ বিভিন্ন শিল্পের উপাদান ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত হয়। লবণের সার্বজনীন, বহুমাত্রিক ব্যবহার ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এই লবণকে শিল্প ক্ষেত্রে ব্যবহার উপযোগী করতে হবে। টেক্সটাইল ও ডাইং শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ২য় আর এই টেক্সটাইল ও ডাইং এ রয়েছে সোডিয়াম ক্লোরাইড তথা লবণের বৈজ্ঞানিক ব্যবহার, বাংলাদেশে রয়েছে কাচ বা গ্লাস শিল্প সেখানেও রয়েছে এর ব্যবহার।

দেশের এসকল শিল্পের ব্যবহারের পাশাপাশি রাসায়নিক ইন্ডাস্ট্রির ব্যবহারের পরে দেশের ঘাটতি মিটিয়ে আমাদের বাইরের দেশেও রপ্তানি করতে হবে। উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে, আমদানির পরিমাণ কমাতে হবে ও রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে হবে।

সর্বপরি পরিমিত পরিমাণে সোডিয়াম ক্লোরাইড বা লবণ যেমন আমাদের খাদ্যের জন্যে, শরীরের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য। তেমনি লবণ বা সোডিয়াম ক্লোরাইড থেকে উৎপাদিত হচ্ছে কাগজ, গ্লাস, সাবান,জীবাণুনাশক তৈরীর কাচামাল, ব্যবহৃত হচ্ছে টেক্সটাইল ও রঞ্জক শিল্পে, বিভিন্ন রাসায়নিক ইন্ডাস্ট্রির কাচামাল তৈরীতে যা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভুমিকা রাখছে।

আসিফ আহমেদ মাহাদী
শিক্ষার্থী, এপ্লািড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ

Leave a Comment