স্বপ্নভূমি হাবিপ্রবি

স্বপ্নভূমি হাবিপ্রবি

তানভির আহমেদ


অনেকের স্বপ্নভূমি হাবিপ্রবি। সবার কাছে হাবিপ্রবি অথবা HSTU নামে পরিচিত হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যের অগ্রযাত্রার ২০ বছরে রয়েছে ফেলে আসা হাজারো স্মৃতি। রাজধানী থেকে ৩৮৩ কি.মি. উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত উত্তরবঙ্গের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়, যা সকলের নিকট উত্তরবঙ্গের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ নামেও পরিচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই হাতের বামে চোখে পড়বে জিমনেসিয়াম। এর পাশেই সুউচ্চ দৃষ্টি নন্দিত ভবন যার নাম ড. এম. ওয়াজেদ মিঞা ভবন। আর ডানপাশে চোখ ধাধানো বিরল প্রজাতির উদ্ভিদে বেষ্টিত বোটানিক্যাল গার্ডেন। এর মাঝে দৃষ্টি নন্দিত ফোয়ারা চত্ত্বর বাড়িয়ে দিয়েছে গার্ডেনের শোভা। ওয়াজেদ ভবনের থেকে একটু সামনে গেলেই চোখে পড়বে প্রশাসনিক ভবন। ভবনের সামনে ও একপাশে দেখা মিলবে বাহারি ফুলের সংমিশ্রণ ও দেশি বিদেশি নানা জাতের ছোট ছোট শোভাবর্ধক গাছ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ৪টি একাডেমিক ভবন সহ ১টি নির্মাণাধীন অর্থাৎ মোট ৫টি একাডেমিক ভবন। এছাড়া অডিটোরিয়াম-১ ও আধুনিক সুবিধা সম্বলিত অডিটোরিয়াম-২, লাইব্রেরি ভবন,মেয়েদের তিনটি হল, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক হল সহ মোট আটটি হল এবং নির্মানাধীন ৭২০ সিটের অত্যাধুনিক ছাত্রী হল। রয়েছে ৫তলা টিএসসি ভবন সহ আরো অনেক স্থাপনা।

এখানে প্রতিনিয়ত গল্প সাজে। ছোট্ট ছোট্ট স্বপ্ন বুনে তরুন প্রজন্ম। এক দিন বড় হবে, খুব বড়! যেখানে দাঁড়িয়ে গাছের মত ছায়া দেবে নিজ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের মানুষগুলির। বিশেষত্ব দিবে সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের।

রাশিক হোসাইন শোভন এই তরুন প্রজন্মের একজন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, স্বপ্ন দেখি হাবিপ্রবি কে নিয়ে, নিয়ে যেতে চাই নতুন এক উচ্চতায়। জীবন যুদ্ধে একজন সফল মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াতে চাই মানুষের। সময় ও নদীর স্রোত কাহারো জন্য অপেক্ষা করেনা। দেখতে দেখতেই একটি বছর চলে গেলো, ক্যালেন্ডারের পাতার সাথে সেমিস্টার ও পরিবর্তন হলো লেভেল ১ এর পাশে।

স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ২০১৬ সালের এপ্রিল। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফেরার পর হাবিপ্রবিতে গিয়েছিলাম। আশা ছিলো ঘুরে দেখবো পুরোটা ক্যাম্পাস ঘুরে দেখবো। ৮৫ একরে কি আছে? সারাদেশের শিক্ষার্থীরা কেন আসে এখানে! তখনো একদমই মাথায় আসেনি যে, মাত্র কয়েক দিন পরে এই জায়গাই হবে আমার নিজের ঠিকানা!

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সকাল ৮ টায় ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে উপস্থিত দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে, জীবনের নতুন এক অধ্যায়। নতুন সব মুখ। হাবিপ্রবি নিয়ে কল্পনাটা ছিল একটু ভিন্ন। এখানে ক্লাস করার চেয়ে ঘোরাফেরা এবং আড্ডা দেওয়া বেশি। স্কুল কলেজের মত ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই।

কিন্তু কোথায় কিসের কল্পনা, এসে দেখি এ এক নতুন জগত! প্রথম দিনের প্রথম ক্লাসেই স্যারের নিয়ম কানুন নিয়ে বিশাল এক লেকচার। ঠিক সময়ে না আসলে ক্লাস এ ঢুকতে দেওয়া হবে না। এই এই করলে এই এই শাস্তি। আবার উপস্থিতির জন্যও ৫ নাম্বার বরাদ্দ। এ কথা শুনে তো রীতিমত চোখ কপালে! সকলের মুখেই এক কথা, নিজ পরিবার ছেড়ে বিভাগের প্রতিটি শিক্ষার্থী এখানে ভাই বোনের সম্পর্কের মতো একে অপরকে নিয়েছে নিজের পরিবারের সদস্য হিসেবে। পিতামাতা তূল্য শিক্ষকও আছে আমাদের। নিজেকে কখনো একা মনে হয়না বিদ্যা অর্জনের এ পথচলায়।

বেগুনি আর হালকা নীল বাসের কথা মনে পড়তেই মনে হলো এখানে আছে কিছু সুখের স্মৃতি। ফাঁকা বাসে বসে বাসায় ফেরার পথে সম্মিলিত কন্ঠে গান গাওয়া তো ছিলো নিত্যনৈমেত্তিক ঘটনা। দিনাজপুর সরকারি কলেজের সামনে দিয়ে যখন হাবিপ্রবির লাল সাদা বাস গুলো সর্বোচ্চ গতিসীমায় চলতো, তখন কিছু অসহায় চোখ তাকিয়ে থাকতো হাবিপ্রবির বাসের দিকে। হয়তো তারাও ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে কিন্তু হাবিপ্রবিতে, কিন্তু চান্স হয়নি। চান্স পায়নি বলে হয়তো অনেক কষ্টও পেত তারা।

এত শত গল্পে স্মৃতি যে আরো আছে ফার্ট গেটের পাশে শাকিল ভাইএর দোকানে বসে চায়ের কাপে ঝড় তোলা, ওয়াজেদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখা, টিএসসিতে কিংবা ঘুমের ঘোরে ক্লাস মিস দেওয়া, সেন্ট্রাল ফিল্ডে বসে গিটারে সুর তোলা, ফিশারিজ পুকুর পাড়ে, লিচু বাগানে জন্মদিন সেলিব্রেশন করা বাসের সিট রাখতে হুড়োহুড়ি করা এসব আমদের দৈনিক রুটিনের অংশ।

ঢেপা নদী থেকে সুখ সাগর, প্রমোদতরী থেকে দাদুবাড়ি সব যায়গায় ছিলো উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের আনাগোনা। এ বিভাগের প্রতিটি শিক্ষার্থী যেনো একেকজন একেকটি অংশ এ পরিবারের। এ বিভাগের শিক্ষক নিয়ে বলতে গেলে অতুলনীয় ও অত্যন্ত বন্ধুসুলভ এককথায় এমন ছাত্রবান্ধব শিক্ষকদেরর জুরি মেলা ভার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন অবধি পরিবারের একটি সদস্যকেও হারাতে চাইনা।

প্রতিদিন কতশত গল্পের জন্ম হত। কত সব চিন্তা আসতো। আড্ডায় ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া এই বন্ধুরা শিক্ষাজীবন শেষে কে কোথায় যাবে তার কি কোনো হদিস থাকবে? গানে আড্ডায় ঘোরাঘুরি আর হালকা পড়াশুনোয় আর শত নিয়ম কানুনের বেড়াজালে ৪টি বছর পার হয়ে যাবে। শুরু হবে সমাপ্তির সূচনা।

চার বছরের এত স্মৃতি, এত সুখ দুঃখ, হাসি কান্না সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় বিদায় বেলায়। দীর্ঘ ৪ বছর আগে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, নিমিষেই তা শেষ হয়ে যাবে, ভাবতেই চোখ ছলছলায়।

আজও বেগুনি নীল রঙের সেই বাসগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি চোখে পড়লেই। আহা… আবারো যদি ফিরে যেতে পারতাম সেই দিনগুলোতে! হয়তো এ রকম আশায় ব্যক্ত করে করে হাবিপ্রবি ছেড়ে আসা সকল শিক্ষার্থী।

বাস্তবতার জাঁতাকলে পিষ্ট প্রতিটি মানুষের মনেই থাকে জীবনে সফল হওয়ার বাসনা। সে পালে হাওয়া দেয় হাবিপ্রবি নামক এই স্বপ্ন রাজ্য। অনেক আশা আকাঙ্খা নিয়ে প্রতি বছর হাজারো শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসে। কেউ সে যুদ্ধে সফল হয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় কেউ বা হারায়। তবে হাবিপ্রবি উজ্জল তার স্বমহিমায়।


লেখকঃ শিক্ষার্থী, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ,
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *